“ওহে মালেক! তুমি কেন তওবা করছ না?”

 “ওহে মালেক! তুমি কেন তওবা করছ না?”

হযরত মালেক দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি দামেশ্ক নগরীর একজন ধনী অধিবাসী ছিলেন। তিনি হযরত মোয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুউনার নির্মিত দামেশ্ক জামে মসজিদে এক বৎসরকাল এ উদ্দেশ্যে এতেকাফ করেছিলেন যে, যদি তিনি সেখানে ইবাদতে মশগুল থাকেন তবে সকলে বিশ্বাস করে উনাকে সে মসজিদ সংলগ্ন সম্পত্তির মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করবেন। এ আশায় বশীভূত হয়ে তিনি সর্বক্ষণ নামাজে ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন। অথচ মনে মনে নিজকে মোনাফেক এবং কপট বলেই জানতেন। এরূপে এক বৎসরকাল অতিবাহিত হয়। একদা রাত্রে তিনি মসজিদ হতে বের হয়ে শুনতে পেলেন, যেন কেহ বলছেন- “ওহে মালেক! তুমি কেন তওবা করছ না?” হযরত মালেক দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি ইহা শুনে বিচলিত হলেন ও ভাবতে লাগলেন এক বৎসরকাল কপটভাবে ইবাদত করেছি। ভক্তি ও ইখলাছের সাথে কিছুই করলাম না, এ অনুতাপ করতে করতে সে রাত্রি হতে পবিত্র ও সরল অন্তকরণে আল্লাহ পাক উনার ইবাদতে মশগুল হলেন। পরদিন প্রাতে মুসল্লিগণ মসজিদে এসে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন, মসজিদে বড়ই বিশৃঙ্খলা ঘটছে। একজন উপযুক্ত মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করা হলে মসজিদের কাজ সুচারূপে সম্পন্ন হবে। মালেক ব্যতীত আমরা অন্য কাকেও এ কাজের উপযুক্ত পাত্র মনে করি না। অতঃপর সকলে একমত হয়ে হযরত মালেক দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খেদমতে উপস্থিত হলো এবং মোতাওয়াল্লীর পদ গ্রহণ করতে উনাকে অনুরোধ করলো। হযরত মালেক দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি মনে মনে বলতে লাগলেন- হে খোদা তাআলা! এক বৎসরকাল মোনাফেকের মত ইবাদত করেছি, কিন্তু কাকেও আমার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত পর্যন্ত করতে দেখিনি। আর একটি মাত্র রাত্র সরল মনে (ইখলাছের সাথে) ইবাদতে মশগুল ছিলাম বলে তুমি মোতাওয়াল্লীর পদ প্রদানের জন্য কতিপয় ব্যক্তিকে আমার নিকট পাঠিয়েছ। আমি তোমার রহমতের কসম (শপথ) করে বলছি, এখন আমার সে আকাঙ্খা আর নেই। এ বলে তৎক্ষনাৎ তিনি মসজিদ হতে বের হয়ে পড়লেন এবং মোতাওয়াল্লীর পদ গ্রহণে অসম্মত হয়ে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন।


 হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সামনে দুই ব্যক্তির ঝগড়া

হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সামনে দুই ব্যক্তির ঝগড়া

একদিন দুই ব্যক্তি নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সামনে ঝগড়া করছিল। আমরা উনার খিদমতে উপবিষ্ট ছিলাম। তাদের একজন ক্রোধান্বিত হয়ে অন্যজনকে গালি দিচ্ছিল। তার মুখমন্ডল রক্তিম হয়ে উঠল। হুযূর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আমি একটি বাক্য জানি। এ ব্যক্তি ওটা পাঠ করলে যা দ্বারা সে আক্রান্ত হয়েছে নিশ্চয়ই তা দূর হয়ে যাবে। সে শুধু বলিবে:

আল্লামা ইবনে কাসীর লিখিয়াছেন- অধিকাংশ ফকীহর মতে “আউজু” পাঠ করা ফরজ বা অপরিহার্য নহে বরং ইহা মুস্তাহাব। ইমাম রাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন- আতা ইবনে আবু রিবাহর মতে নামাজের ভিতরে ও বাহিরে কোরআন মজীদ তিলাওয়াতের পূর্বে আউজু ওয়াজিব। ইবনে সীরিন বলিয়াছেন- জীবনে একবার “আউজু” পাঠ করলেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। আতা ইবনে আবু রিবাহর পক্ষে ইমাম রাজী নিম্নোক্ত দলীল পেশ করেন-

فاذا فرات قران فاستعذبالله من الشيطان الرجيم

উক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ পাক কোরআন শরীফ পাঠের সময় আউজু পাঠ করার জন্য আদেশ করছেন। আদিষ্ট কাজ স্পষ্টতই ওয়াজিব। ইহার সপক্ষে তিনি হুযূর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কার্যধারাও প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন। হুযূর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিলাওয়াতের পূর্বে সর্বদা আউজু পড়তেন। অধিকন্তু উহা দ্বারা শয়তানের কুমন্ত্রনা ও প্ররোচনা প্রতিহত হয়। মূলতঃ যে কাজের সহায়তা ব্যতীত ওয়াজিব সম্পন্ন হতে পারে না তাও ওয়াজিব। সুতরাং আউজু পাঠ করা ওয়াজিব। উহা ওয়াজিব হবার আরও একটি কারণ এই যে, উহা শয়তানের প্ররোচনা হতে রক্ষা করে। কোন বিষয় ওয়াজিব হবার ইহাও একটি পূর্বশর্ত।

কেহ কেহ বলেন ‘আউজু’ পাঠ শুধু হুযূর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য ওয়াজিব ছিল। উনার উম্মতের উপর ওয়াজিব নহে। ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি ফরজ নামাজে তা আউজু পড়তেন না। তিনি শুধু রমজানের প্রথম রজনীতে সুন্নত (তারাবী) নামাজে তা আউজ পড়তেন। ইমাম শাফেঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে লিখেছেন মুসল্লীরা সরবে তাআউজ পড়বে তবে নীরবে পড়লে ক্ষতি নেই। তিনি উনার কিতাবে বলেন, উহা উচ্চ কি অনুচ্চ যে কোন স্বরে পড়লেই চলবে কারণ হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অনুচ্চ স্বরে ও হযরত আবু বকর সিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উচ্চ স্বরে পড়তেন।

ইমাম শাফেঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রথম রাকাআত ভিন্ন অন্যান্য রাকাআতে তাআউজ পাঠ করাকে মুস্তাহাব বলেন কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদলের মতে তিনি মুস্তাহাব বলেন। অন্যদলের মতে তিনি মুস্তাহাব বলেন না। শেষোক্ত মতই সবল।

ইমাম শাফেঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তাআউজ পাঠে-

 اعوذ بالله من الشيطان الرجيم 

বললেই চলবে।

ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নামাজে যে তাআউজ পড়ার বিধান রয়েছে, উহা কোরআন শরীফের তিলাওয়াতের কারণে প্রদত্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে ইমাম আবু ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন- উক্ত বিধান নামাজের কারণে প্রদত্ত হয়েছে। তাই ইমাম আবু ইউসুফ বলেন, মোক্তাদী নামাজে কিরাআত পড়বেনা বটে, তাআউজ পড়বে। তেমনি ঈদের নামাজে তাকবীরে তাহরীমার পরও অতিরিক্ত তাকবীরের পূর্বে তাআউজ পড়বে। পক্ষান্তরে তাকবীরের পর তাআউজ পড়তে হবে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১ম খন্ড)


 হযরত ইমাম হুসাইন ( ইমামুছ ছালিছ) আলাইহিস সালাম  উনার শাহাদত মুবারক

 

হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাহাদত মুবারক

অনেকে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাহাদত উপলক্ষে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও অন্য অনেক সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগনকে দোষারোপ করে থাকে  যা আদৌ সঠিক নয় বরং এটা কুফরী। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ করা হয়- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত মোয়াফা ইবনে ইমরান রহমতুল্লাহি আলাইহি তারা দু’জন বিশ্ব বিখ্যাত বুজুর্গ ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন আমিরুল মোমেনীন ফিল হাদীস। অর্থাৎ হাদীস শাস্ত্রে যিনি আমিরুল মোমেনীন, উনাকে জিজ্ঞেস করা হল, “হুযূর, হযরত মুয়বিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুউনার মর্যাদা বেশী না হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমতুল্লাহি আলাইহিউনার মর্যাদা বেশী। তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং উনার সঙ্গী যিনি ছিলেন তিনি বললেন যে, দেখ হযরত মুয়বিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে জেহাদে যেতেন তখন উনার ঘোড়ার পায়ের দাপটের জন্য যে ধুলাগুলি ঘোড়ার নাকে প্রবেশ করতো সে ধুলাগুলিও হযরত ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। (সুবহানাল্লাহ) তিনি আরও বললেন যে, হযরত আলাইহিস সালাম মর্যাদা বেশী না হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মর্যাদা বেশী? জবাবে বলা হল- হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম তো নবী, তার সাথে কোন তুলনাই হয়না।

তদ্রুপ সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের সাথে পরবর্তী উম্মতদের কোন তুলনাই হয়না। উনাদের সাথে কোন তুলনা করা আদবের খেলাপ। তাই আল্লাহ পাক কোরআন কারীমায় এরশাদ ফরমান- “নিশ্চয়ই যারা আমাকে এবং আমার রাসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়, তাদের ইহকাল এবং পরকালে লানত এবং তাদের জন্য লাঞ্চিত শাস্তি রয়ে গেছে। বুখারী শরীফের একটা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে- আল্লাহ পাককে ভয় কর আল্লাহ পাককে ভয় কর আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের ব্যাপারে। আমার পরে তাঁদেরকে তিরস্কারের লক্ষ্যস্থল করোনা। তাঁদেরকে যারা মহব্বত করল তারা আমাকে মহব্বত করার কারণেই করল। তাঁদেরকে যারা কষ্ট দিল তারা আমাকেই কষ্ট দিল। আর যারা আমাকে কষ্ট দিল তারা আল্লাহ পাককেই কষ্ট দিল। আর যারা আল্লাহ পাককে কষ্ট দিল তাদেরকে আল্লাহ পাক পাকড়াও করবেন। মেশকাত শরীফের একটা হদীসে উল্লেখ করা হয় “যে আমার (হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার) সাহাব-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগনের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করে সে কাফির। আল্লাহ পাক বলেন, একমাত্র কাফিররাই সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ সম্পর্কে বিদ্বেষ করে।

উপরোক্ত কোরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা বুঝা যায় যে, সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ সম্পর্কে বিদ্বেষ পোষন করা কুফরী।


 আশুরাকে সম্মান করলে যে কি ফজিলত হয়

 

আশুরাকে সম্মান করলে যে কি ফজিলত হয়

আশুরাকে সম্মান করলে যে কি ফজিলত হয় তার একটা ওয়াকিয়া বর্ণনা করা হয়- এক ব্যক্তি ছিল গরীব, দিনমজুর। একবার অসুস্থতার কারণে তিনি তিন দিন যাবত কাজ করতে পারলেন না। চতুর্থ দিন ছিল আশুরার দিন। তিনি আশুরার দিনে ভাল খাওয়ার ফজিলত সম্পর্কে জানতেন। তখন ছিল কাজীদের (বিচারক) যুগ। কাজী সাহেব ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তার কাছে আশুরায় ফজিলতের কথা বলে এবং নিজের অসুস্থ্যতা ও পরিবারের তিনদিন যাবত অভুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে ১০ সের আাঁ, ১০ সের গোস্ত ও দুই দিরহাম চাইলেন। কাজী সাহেব তাকে যোহরের সময় আসতে বললেন। যোহরের সময় কাজী সাহেব বললেন আছরে আসতে। কিন্তু এর পরে আসরের সময় মাগরেব এবং মাগরেবের সময় সরাসরি না করে দিলেন। দুঃখে অধীর হয়ে লোকটি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হল। পথে ছিল এক খৃষ্টানের বাড়ী। লোকটিকে কাঁদতে দেখে উক্ত খৃষ্টান উনাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করল। কিন্তু তিনি বিধর্মী বিধায় খৃষ্টানকে প্রথমে কিছু বলতে চাইলেন না। অতঃপর খৃষ্টানের অধীর আগ্রহের কারণে তিনি আশুরার ফজীলত ও তার বর্তমান দুরবস্থার কথা ব্যক্ত করলেন। খৃষ্টান ব্যক্তি তখন উৎসাহী হয়ে তাকে আশুরার সম্মানার্থে ১০সের আাঁ, ১০সের গোস্ত, ২ দিরহাম এবং অতিরিক্ত আরও ২০ দিরহাম দিল এবং বললো যে তোমাকে আমি আশুরার সম্মানার্থে প্রতিমাসে এ পরিমাণ হাদিয়া দিব।

ঐ ব্যক্তি তখন তা নিয়ে বাড়ীতে গেল এবং খাবার তৈরী করে ছেলে-মেয়েসহ আহার করল। অতঃপর দোয়া করলো, “হে আল্লাহ পাক যে ব্যক্তি আমাকে সন্তষ্ট করলো আমার ছেলে-মেয়েদের মুখে হাসি ফোটালো আল্লাহ পাক আপনি তার দিল খুশি করে দেন, তাকে সন্তষ্ট করে দিন”।

ঐ রাত্রে কাজী সাহেবকে স্বপে¦ দেখানো হলো যে, কাজী সাহেবকে বলা হচ্ছে, হে কাজী তুমি মাথা উত্তোলন করো। মাথা তুলে কাজী দেখতে পেলেন যে তার সামনে দুটি বেহেস্তের বালাখানা একটি স্বর্ণের আরেকটি রৌপ্যের। কাজী সাহেব বললেন হে আল্লাহ পাক এটা কি? গায়েবী আওয়াজ হলো এ বালাখানা দুটি তোমার ছিল। কিন্তু কিন্তু এখন আর তোমার নেই। কারণ তোমার কাছে যে গরীব লোকটা এসেছিল তাকে তুমি সাহায্য করার ওয়াদা করে ওয়াদা ভঙ্গ করেছ। এজন্য এ বালাখানা দুটি এখন একজন খৃষ্টান লোকের। কাজী সাহেব বললেন আল্লাহ পাক কোন সে খৃষ্টান। কাজী সাহেব

অতঃপর ঘুম থেকে উঠে ওজু ও নামাজ আদায় করে সেই স্বপে¦র খৃষ্টানের বাড়ীতে গেল। খৃষ্টান কাজী সাহেবকে দেখে বিস্ময়াভুত হলো কাজী সাহেবকে খৃষ্টান বললো, আপনি এত সকালে কি জন্য এলেন? কাজী সাহেব বললো- হে খৃষ্টান ব্যক্তি তুমি গতরাত্রে কি কোন নেককাজ করেছ? খৃষ্টান ব্যক্তি বলতে নারাজ। তিনি বললেন কি ব্যাপার হয়েছে আগে বলেন তারপর বলবো। তখন কাজী সাহেব বললেন যে এই ঘটনা ঘটেছে এবং তুমি নিশ্চয়ই গরীব লোকটাকে সাহায্য করেছ। তখন খৃষ্টান ব্যক্তি তা স্বীকার করল। কাজী সাহেব বললো যে তুমি তো খৃষ্টান তুমি মরলে জাহান্নামে যাবে। তুমি তো এই বালাখানা পাবেনা। তোমার এটা নিয়ে কি ফায়দা হবে? তুমি তোমার এই নেক কাজ এক লক্ষ দেরহামের বিনিময়ে আমার নিকট বিক্রি করে দাও এবং তুমি তার কাছে প্রত্যেক মাসে যে ওয়াদা করেছ আমি তাকে তা দিয়ে দিব। খৃষ্টান ব্যক্তি বললো এটা কখনও সম্ভব নয়। হে কাজী তুমি সাক্ষী থাক আমি কলেমা শরীফ পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব এটা ফিকির করার কথা যে আশুরাকে সম্মান করার কারনে আল্লাহ পাক উক্ত খৃষ্টানকে ঈমান দিয়ে দিলেন এমনকি জান্নাত নসিব করলেন। এই জন্য আলাহর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “যে ব্যক্তি আশুরাকে সম্মান করবে আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতের দ্বারা সম্মানিত করবেন।” সুতরাং এটা ফিকিরের বিষয়।

আশুরা দিবসের আমল সম্পর্কে আরও উল্লেখ করা হয়েছে আশুরার সম্মানার্থে কেউ যদি গোসল করে তাহলে আল্লাহ পাক তাকে রোগ থেকে মুক্তি দান করবেন এবং এক বৎসরের মধ্যে মৃত্যু ব্যতীততার আর কোন কঠিন রোগ হবেনা।

জিলক্বদ-জিলহজ্জ-১৪১১, জৈষ্ঠ-আষাঢ়-১৩৯৮, জুন-১৯৯১ ঈসায়ী


 আইয়ামে জাহিলিয়াহ বিরাজমান অবস্থায় মেয়ে সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া


আইয়ামে জাহিলিয়াহ বিরাজমান অবস্থায় মেয়ে সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া

আরব অন্ধকার যুগে তথা আইয়ামে জাহিলিয়াহ বিরাজমান অবস্থায় মেয়ে সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া নিয়ম ছিল। সে জীবন্ত মেয়ে সন্তানের কবর দেওয়া দলের প্রধান ছিলেন হযরত দাহিয়াতুল কালবি রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহন করে আইয়ামে জাহেলিয়ার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তিনি যখন হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট আসলেন। ইসলামের দীক্ষায় দীক্ষিত হতে হাত দু’টি বাড়িয়ে দিলেন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দিকে। আল্লাহ পাক উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাত ধরবেন এমন সময় তিনি আবার হাত দু’টি গুটিয়ে নিলেন এবং বললেন- হুযূর আমি আরবের বুকে মেয়ে সন্তানকে জীবিত কবর দেওয়া দলের প্রধান। তাছাড়া আমার স্ত্রী আমার অজান্তে একটি মেয়ে সন্তানকে লালন পালন করছিল, ১০/১২ বৎসর বয়সে তা আমার চোখে ধরা পড়ে। মেয়েটির রূপ চেহারায় আমিও পিতৃস্নেহে অভিভূত হয়ে গেলাম। জাহেলিয়ার নীতি আমাকে বার বার তাড়া করতে লাগলো, তুমি আরবের বুকে মেয়ে সন্তান জীবন্ত কবর দেওয়া দলের সর্দার হয়ে পিতৃস্নেহের কাছে হেরে গেলে? পরিশেষে বাধ্য হয়ে মিথ্যে ছলনায় স্ত্রীকে বললাম, মেয়েকে সুন্দর ও পরিপাটি করে সাজিয়ে দাও। তাকে নিয়ে বেড়াতে যাব। মেয়েটিকে নিয়ে মরুময় পথ ধরে অনেক দূরে চলছি। মরুময়পথে আমি ও আমার সন্তানই যাত্রী। মেয়েটির রূপ, লাবণ্যময়ী চেহারা আমাকে উন্মাদ করে তুলছিল। কিন্তু কি করব? জাহিলিয়ার নীতির কাছে হেরে গেলাম। মেয়েটি বললো, আব্বা আমাকে একটু পানি দেন। বললাম, মা একটু অপেক্ষা কর, এ সুযোগেই আমার কবর দেওয়ার লুকাইত যন্ত্রপাতি বের করে মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম। অনেক গভীর করে উপরে উঠে এলাম। মেয়েটি তৃষ্ণার্ত নয়নে আমার পানে তাকিয়ে দেখছিল। মেয়েকে বললাম, দেখতো মা, পানি উঠছে কিনা? মেয়েটি অধীর আগ্রহে তাকাতেই দু’চোখ বন্ধ করে মেয়েকে কুপের মধ্যে ফেলে দিয়ে মাটি দিতে শুরু করি। হুযূর! মেয়েটির সে কান্না আর আমাকে আব্বা আব্বা বলে ডাকার শব্দ আমার কানে আজও ভেসে উঠে। বলুন হুযূর, এমন পাপাত্মা পিতা, মেয়ে সন্তানদের জীবিত কবর দেওয়ার যে পাপ আমি করেছি, এমন পাপ নিয়ে ইসলাম কি আমাকে গ্রহন করবে?

হযরত দাহিয়াতুল কালবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুউনার কথা শুনে দয়াল নবীর দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। তাকিয়ে থাকলেন তার মুখ পানে। ওহি না আসা পর্যন্ত আল্লাহ পাক উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কথা বলেন না। তিনি চুপ করে থাকলেন, এমন সময় হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম আগমন করেন এবং বলেন, হে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনি দীপ্ত কক্তে ঘোষণা করুন, “আল ইসলামু ইয়াহদিমু মাক্বানা ক্বাবলাহু” অর্থঃ “ইসলাম বিগত জীবনের সমস্ত পাপরাশিকে ক্ষমা করে দেয়। এ ঘোষণার পর হযরত দাহিয়াতুল কালবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইসলামে দাখিল হলেন। তিনি এমন সুন্দর ও সুদর্শন ছিলেন যে, মানব সুরতের অধিকাংশ সময়ই জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম উনার আকৃতিতে ওহী নিয়ে আসতেন। এমন সুমহান ধর্মে আছি বলে সত্যিই স্বার্থক আমাদের জীবন। তবে এ ইসলামের বিধিনিষেধ বা রোকনগুলি সম্বন্ধে আল্লাহ পাক উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন, সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ যে সত্য পথ অবলম্বনে আমাদের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন, সে আদর্শেই শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজমান। আমরা আজ সে পথ ও মত হতে অনেক দূরে সরে এসেছি বলেই আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত।

জিলক্বদ-জিলহজ্জ-১৪১১, জৈষ্ঠ-আষাঢ়-১৩৯৮, জুন-১৯৯১ ঈসায়ী


 মদীনা শরীফ-এর সেই ছেলেটি...

 মদীনা শরীফ-এর সেই ছেলেটি...

এক ঈদের দিনে মদীনার ঘরে ঘরে আনন্দ, আল্লাহ পাক উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের জমায়াত শেষে সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু গণকে নিয়ে যার যার বাড়ী ফিরার পথে। তখনই আমাদের মহানবী হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চোখ পড়লো মাঠের দিকে। তিনি দেখেন মলিন কাপড় পরিহিত, নিরানন্দ মুখে একটি ছেলে মাঠে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। রহমতের সাগর, মহানবী ছুটে গেলেন ছেলেটির কাছে। জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুমি কাঁদছ কেন?” উত্তরে ছেলেটি বলল, হুযূর আমি মাতৃকোলে আসার অনেক আগেই আমার পিতার মৃত্যু হয়েছে। শৈশবেই মাকেও হারিয়ে এতিম। আজ এ ঈদের দিনে কে দেবে আমাকে নতুন জামা কাপড়? কে কোলে তুলে নিয়ে আনন্দ করবে? কে আমাকে সান্ত¡না দেবে?

অনাথ এতিম ছেলের কথাগুলি শুনে সৃষ্টিকূলের রহমতের ভান্ডার দয়াল নবী অশ্রুসিক্ত নয়নে ছেলেটিকে কোলে তুলে নিলেন এবং বললেন- “বাবা, আমি তোমার মত মা-বাবাকে হারিয়ে ছোটকালেই এতিম। আজ থেকে আমি তোমার পিতা, আয়শা তোমার মা, ফাতেমা তোমার বোন বলে মনে করো।” এই বলে নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছেলের কপালে চুমো দিয়ে আদর করলেন এবং হুজরা মুবারকে পৌঁছুলেন। উম্মুল মো’মেনিন হযরত আয়শা সিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনাকে ডেকে বললেন, “দেখ হে আয়শা! তোমার জন্য একটি ছেলে নিয়ে এসেছি, তুমি তাকে আপন ছেলের মতো মনে করে লালন-পালন কর।”

হযরত আয়শা সিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ছেলেটিকে আদরে কোলে তুলে নিলেন। নিজের হাতে গোসল করিয়ে দিলেন, নতুন জামা-কাপড় পরালেন এবং খেতে দিলেন, নিজের ছেলের মত ছেলেটিকে লালন-পালন করতে লাগলেন।

জিলক্বদ-জিলহজ্জ-১৪১১, জৈষ্ঠ-আষাঢ়-১৩৯৮, জুন-১৯৯১ ঈসায়ী


 হযরত ওয়ায়েস আল করনী রহমতুল্লাহি আলাইহি এখলাছের আর একটি উজ্জল নমুনা

 হযরত ওয়ায়েস আল করনী রহমতুল্লাহি আলাইহি এখলাছের আর একটি উজ্জল নমুনা 

যখন হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অছিয়ত মোতাবেক উনার পবিত্র জুব্বা মোবারক হযরত ওয়ায়েস আল করনী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে প্রদানপূর্বক ফেরার পথে হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কিছু নছিহত করতে অনুরোধ করায় তিনি বললেন, “হযরত ওমর! আপনি কি খোদাকে চিনেছেন?” হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “হাঁ নিশ্চয়ই চিনেছি।” হযরত ওয়ায়েস আল করনী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “যদি উনাকে ব্যতীত অন্য কাউকেও না জানেন (চিনেন) তবে উহা আপনার জন্য উত্তম।” হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “আরও কিছু নছিহত করুন।” হযরত ওয়ায়েস আল করনী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “খোদা তা’য়ালা কি আপনাকে জানেন?” তিনি বললেন, “হাঁ জানেন।” হযরত ওয়ায়েস আল করনী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “তিনি ব্যতীত অন্য কেউ আপনাকে না চিনলেও কোন ক্ষতি নেই।” ইহাই ইখলাস। (অসমাপ্ত)

জিলক্বদ-জিলহজ্জ-১৪১১, জৈষ্ঠ-আষাঢ়-১৩৯৮, জুন-১৯৯১ ঈসায়ী


 হযরত রাবেয়া বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহা: ইবাদত কেন করেন !

 হযরত রাবেয়া বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহা: ইবাদত কেন করেন ! 

একদা একদল লোক হযরত রাবেয়া বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট হাজির হন। তন্মধ্যে একজনকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা ! আপনি আল্লাহ পাক উনার ইবাদত কেন করেন?” তিনি বললেন- “দোযখের সপ্ত স্তর বড়ই ভীষণ এবং সকলকে একদিন উহার উপর দিয়ে গমন করতে হবে। সেই দোযখের শাস্তির ভয়ে ইবাদত করি।” অপর একজন বললেন- “বেহেস্তেতে সৌন্দর্য্যময় অট্টালিকারাজি এবং নানাবিধ আরামের এবং নিয়ামতের জন্য খোদা প্রদত্ত ওয়াদা বিদ্যমান আছে, তজ্জন্যই আমি এই ইবাদত করছি।” ইহা শুনে হযরত রাবেয়া বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন- “যে ব্যক্তি দোযখের ভয়ে ও বেহেস্তের লোভে স্বীয় প্রভূর ইবাদত করে, সে বড়ই হেয় ও হতভাগ্য।” তারা বললেন, “আচ্ছা ! বলুনতো, আপনি কেন উনার ইবাদত  করছেন? আপনার  কি কোন  বাসনা নেই?” তিনি বললেন, “আমার পক্ষে বেহেস্ত এবং দোযখ উভয়ই সমান। তিনি ইবাদত করার জন্য আদেশ করেছেন, আমার জন্য কি ইহাই যথেষ্ট নয়? কোন শাস্তির ভয় বা লোভণীয় কিছু না থাকলে উনার ইবাদত করা মানুষ মাত্রেরই কর্তব্য নয় কি?”

হযরত রাবেয়া বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মোনাজাতে বলতেন, “হে খোদা! যদি আমি দোযখের ভয়ে তোমার উপাসনা করি, তবে তুমি আমাকে দোযখে নিক্ষেপ করো, আর যদি বেহেস্তের আশায় তোমার উপাসনা করি, তবে বেহেস্ত হতে তুমি আমাকে বঞ্ছিত করো। আর যদি কেবল তোমার সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই আমি উপাসনা করি তবে তোমার স্থায়ী সৌন্দর্য্য হতে আমাকে বঞ্ছিত করো না।”


ইমাম জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ওয়াকেয়া মুবারক- কুল্লা ইয়াওমিন হুয়া ফী শান

ইমাম জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ওয়াকেয়া মুবারক- কুল্লা ইয়াওমিন হুয়া ফী শান

এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তিনি একবারসূরা আর-রহমান শরীফ উনার ছোট্ট একখানা পবিত্র আয়াত শরীফ - كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِىْ شَأْنٍ


উনার তাফসীর করলেন একাধারা দুই বৎসর। তবুও যেন তাফসীর বাকী রয়ে গেল। উনার ভিতরে একটা ফখরেরভাব পয়াদ হলো, নিশ্চয়ই তিনি মস্ত বড় একজন তাফসীরকারক। উনার মতো তাফসীরকারকহয়তো আর কেউ নেই। অন্যথায় একখানা আয়াত শরীফ উনার তাফসীর দুই বৎসর করার পর বাকী থাকারকথা নয়। এরই মধ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছায় এক আগন্তুক উনার তাফসীরের মজলিসে গিয়েউনাকে প্রশ্ন করলেন, হুযূর! আপনি তাফসীর করছেন যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি প্রত্যেহ একেক শানেঅবস্থান করেন। বলুন তো মহান আল্লাহ পাক তিনি এখন কোন শান মুবারকে আছেন এবং এখন তিনিকি করছেন? এ প্রশ্ন শুনে হযরত ইমাম ইবনু জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি চুপহয়ে গেলেন। কোন উত্তর দিতে পারলেন না।দ্বিতীয় দিন আবার যখন তিনি তাফসীর করা শেষ করলেন সাথে সাথে উক্ত আগন্তুক ব্যক্তি একই প্রশ্ন করেবসলেন, সেদিনওতিনি কোন জাওয়াব দিতে পারলেন না। তৃতীয়দিনও একই ঘটনা ঘটলো। তিনি যারপর নেই লজ্জিত হলেন।রাতের বেলা তিনি খুব কান্নাকাটি করলেন, তওবা-ইস্তিগফার করলেন এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহহুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উসীলা দিয়ে ফায়সালা কামনা করে ঘুমিয়েপড়লেন। স্বপ্নযোগে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামতিনি সাক্ষাৎ মুবারক দিয়ে বললেন, হে ইবনে জাওযী! আপনার কি হয়েছে?ইবনে জাওযী রহমতুল্লাহিআলাইহি নিজের অক্ষমতার কথা ব্যক্ত করলেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, যিনি আপনাকে প্রশ্ন করছেন, উনাকে আপনি চিনেন?তিনি বললেন যে,না। নূরে মুজাসসামহাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন,প্রশ্নকারী ব্যক্তিহচ্ছেন হযরত খিযির আলাইহিস সালাম। তিনি আগামীকালও আসবেন এবং আপনাকে উক্ত বিষয়ে আবারপ্রশ্ন করবেন। তখন আপনি জাওয়াবে বলবেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি হচ্ছেন ক্বদীম। উনারশান হচ্ছে আযালী-আবাদী শান মুবারক। কাজেই, তিনি নতুন করে কোন কাজ শুরু করেন না। তিনিশুরুতে যা করেছেন এখনও তাই করেন। তবে কখনও কখনও উনার কোন কোন শান মুবারক প্রকাশ পায়। সুবহানাল্লাহ!সত্যিইপরের দিন আগন্তুক ব্যক্তি এসে যখন প্রশ্ন করলেন তখন সহসাই হযরত ইবনে জাওযী রহমতুল্লাহিআলাইহি তিনি প্রশ্নের জাওয়াব দিয়ে দিলেন। জাওয়াব পেয়ে আগন্তুক ব্যক্তি তিনি বললেন,হে ইবনে জাওযী রহমতুল্লাহিআলাইহি! আপনি আপনার যিনি নবী ও রসূল, নূরে মুজাসসাম,হাবীবুল্লাহ হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি অধিক পরিমাণে ছলাত-সালাম পেশ করুন যিনিআপনাকে আমার সুওয়ালের জাওয়াব জানিয়ে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!
 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু: উটের গোশত

 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু: উটের গোশত- 

শানে নুযুল-
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আসাদ ইবনে ওবাইদ সায়লাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রমুখ সাহাবা-ই-কিরাম, উনারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ইহুদী পন্ডিত ছিলেন, উনাদের সম্পর্কেই এ আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে বলে তফসীরকারকগণ লেখেন। ইহুদী ধর্মের বিধানানুসারে শনিবার ছিল সপ্তাহের পবিত্র দিন এবং এ দিনকে সম্মান করা ছিল ওয়াজিব। আর খাদ্য হিসাবে উটের গোশত ছিল হারাম। যেহেতু উনারা ইহুদী পন্ডিত ছিলেন, ইহুদী থাকা অবস্থায় এ ধর্মের অনুশাসনগুলি ঠিকভাবেই মেনে চলতেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর উনাদের মাঝে ইহুদী ধর্মের ঐ দু’টি অনুশাসনের প্রভাব রয়ে গিয়েছিল। (কেননা স্বাভাবিকভাবেই হঠাৎ করে কোন কঠিন বিষয়, যা বহুদিনের অভ্যাস তা পরিবর্তন করা যায় না, যেমন আল্লাহ পাক নিজে মদ একবারে হঠাৎ করে হারাম ঘোষণা করেন নাই) উপরন্তু উনারা ধারণা করলেন ইসলাম ধর্মে শনিবারকে অসম্মান করা ওয়াজিব নয়, কাজেই যদি যথারীতি শনিবারকে সম্মান প্রদর্শন করা হয এবং উটের গোশত হালাল জেনেই তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা যায় তবে একদিকে যেমন হযরত মুসা আলাইহিস সালামউনার শরীয়তের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করা হবে তেমনি অপরদিকে ইসলাম ধর্মেরও। অধিকন্তু এতে আল্লাহ পাক উনার অধিকতর আনুগত্য এবং বিনয় প্রকাশ পাবে বলে মনে হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক এ আয়াত শরীফ নাযিল করেন।

কোন কোন তফসীরকারক এ আয়াত শরীফ নাযিল হওয়ার ক্ষেত্রে একটি ঘটনার উল্লেখ করেন-

একদা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবারে বসা ছিলেন। এমন সময় উটের গোশতসহ কিছু খাদ্য হাজির করা হল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন যে, তিনি পূর্বে ইহুদী পন্ডিত ছিলেন এবং সেই ধর্মে উটের গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ বিধায় তিনি তা গ্রহণ করতেন না। কাজেই এখনও তিনি উটের গোশত গোশত খাওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট অনুমতি চাইলেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ করে থাকলেন এবং আল্লাহ পাক উনার বিধানের অপেক্ষায় রইলেন। কেননা

وما ينطق عن الهوى. ان هو الا وحى يوحى.

অর্থঃ “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী ব্যতীত নিজের থেকে কোন কথা বলেন না। তখন আল্লাহ পাক এ আয়াত শরীফ নাযিল করলেন।

বিশ্লেষণ - ফাওয়ায়েদে ওসমানী কিতাবে এ আয়াত শরীফের তফসীরে বলা হয়েছে, “এ আয়াতের উদ্দেশ্য হলো বিদআতের দুর্গকে বিনষ্ট করা। কেননা বিদআত হলো কোন কাজকে উত্তম ভেবে ধর্মের অঙ্গস্বরূপ গ্রহণ করা। এমন কাজকে পূণ্য কাজ বা ধর্মীয় কাজ মনে করে তার প্রচলন করা।”

পরিপূর্ণভাবে ঈমান অর্জন এবং বিদআতকে বর্জনেরই নির্দেশ রয়েছে এ আয়াত শরীফে। তাই এরশাদ হয়েছে- “হে মুমিনগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো।”

বয়ানুল কোরআন কিতাবে এ আয়াত শরীফের তফসীরে বলা হয়েছে, “এ আয়াত শরীফে সতর্কবাণী রয়েছে একদিকে সেসব লোকদের জন্য যারা মূর্খ বিদআত কাজে লিপ্ত আর অন্যদিকে যারা নিজেদেরকে আধুনিক মনে করে এবং আকিদা বিশ্বাসে কথায় ও কাজে ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবন বিধানরূপে মেনে নেয়না। কেননা শয়তান তাদেরকে ইসলাম বিরোধী কাজে মুগ্ধ করে রাখে।

জিলক্বদ-জিলহজ্জ-১৪১১, জৈষ্ঠ-আষাঢ়-১৩৯৮, জুন-১৯৯১ ঈসায়ী