নওরোজ তথা বাংলা, ইংরেজী, আরবী বা যে কোনো বর্ষপুঞ্জির প্রথম দিন বা নববর্ষ পালন করা হারাম এবং কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত
আরবের ইহুদী মহিলার জান্নাত যাওয়ার ঘটনা.....
এই প্রসঙ্গে অনেক আগের একটি ঘটনা যাহা কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরব দেশের এক এলাকায় একজন ইহুদী মহিলা বসবাস করত। সে মারা যাবার পর এক বুজুর্গ ব্যক্তি স্বপে¦ দেখেন যে মহিলাটি বেহেশতে বিচরণ করছে। সে ঈমান এনেছিল কিনা সেটা কেউ জানত না। এটা দেখে সেই বুজুর্গ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, “হে মহিলা! তুমি কি করে জান্নাতে স্থান পেলে? কারণ জান্নাত তো কাফিরদের জন্য হারাম। তুমিতো জাহান্নামে যাওয়ার কথা।” সে বলল, হুযূর ! একটা ঘটনা ঘটে গেছে, সেটা হয়ত আপনার জানা নেই। কি ঘটনা? সে বলল, আমার মৃত্যুর পূর্বে যে রমজান মাস অতিবাহিত হয়েছিল, সেই রমজান মাসে আমি একবার বাজারে গেলাম কিছু খরিদ করার জন্য। সাথে একটা বাচ্চা ছিল, তার বয়স ৩ থেকে ৪ বছর। তাকে কোলে করে নিয়ে কিছু রুটি বিস্কুট খরিদ করে সে বাচ্চার কাছে রাখতে দিলাম। বাচ্চাটা রাস্তার মধ্যে প্রকাশ্যে খাওয়া শুরু করল। আমি তাকে একটা আঘাত বা থাপ্পড় দিয়ে বললাম হে ছেলে, তুমি যদিও বাচ্চা, আর যদিও আমরা মুসলমান নই তবুও এটা মুসলমানদের রমজান মাস, এটাকে সন্মান করতে হবে, তুমি খেওনা। আমি রুটি বিস্কুটগুলো কেড়ে নিলাম তার কাছ থেকে। আল্লাহ পাক এর বদৌলতে পরবর্তী সময়ে আমাকে মৃত্যুর পূর্বেই ইমান নসিব করেছিলেন। যার বদৌলতে আজকে আমি জাহান্নামে না গিয়ে জান্নাতে গিয়েছি (সুবহানাল্লাহ)। এখন চিন্তা করেন। আদনা দরজা হলো যদি কেউ তার মোটামুটি ঈমানের হক আদায় করে নেয়, তাহলে অবশ্যই সে চিরস্থায়ী আজাব থেকে বেঁচে যাবে।
রমাদ্বান-১৪১২, চৈত্র-১৩৯৮, এপ্রিল-১৯৯২ ঈসায়ী
হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তাক্ওয়া
এ প্রসঙ্গে হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি এর একটা ওয়াকেয়া উল্লেখ করা হয়। ওয়াজের মধ্যে কতটুকু তাক্ওয়ার সাথে বলতে হবে এবং কতটুকু তাক্ওয়ার সাথে শুনতে হবে। হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি এর দর্সে উনার ছাত্র ও বাইরের হাজার হাজার লোক উপস্থিত থাকত। একবার তিনি তা’লীম বা দর্স দিচ্ছিলেন। ছাত্র ও অন্যান্য শ্রোতারা তা’লীম বা দর্স শুনছিল, এমতাবস্থায় দেখা গেল একটা সাপ সেই দর্সের মাহফিলে প্রবেশ করল। সাপটা পর্যায়ক্রমে হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি এর দিকে আসতে লাগল, কিন্তু হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তা’লীম দিতেই থাকলেন। সাপের কোন পরওয়া করলেন না। সাপটা এসে পর্যায়ক্রমে হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি এর পা মোবারকে কামড় দেয়া শুরু করল। একে একে সাতবার কামড় দিল। সপ্তমবার কামড় দেয়ার পর সাপটা নিজেই মরে পড়ে গেল। তিনি উনার দর্স দিতেই থাকলেন। দর্স যখন শেষ হলো তখন হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি এর এক মহব্বতের ছাত্র এসে বলল হুযূর, একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করব যদি বেয়াদবি মনে না করেন। হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, বেশ জিজ্ঞেস কর কি মাসআলা। সে ছাত্র বলল, হুযূর আমরা সাধারণতঃ জানি সাপ যদি মানুষকে কামড় দেয় তাহলে মানুষ মারা যায়। কিন্তু আজকে আমরা যা দেখলাম তা বিপরীত। আপনি যখন দর্স দিচ্ছিলেন, তখন সাপটা আপনাকে একে একে সাতবার কামড় দিল। আপনার কিছুই হ’ল না, শেষ পর্যন্ত সাপটা নিজেই মরে গেল। তার কি কারণ? হযরত ইমাম আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “দেখ! তুমি যা বলছ তা সত্যই। সাপটা এসেছিল আমাকে কামড় দিয়ে তার বিষ আমার শরীরে প্রবেশ করাতে কিন্তু একে একে সে ছয়বার আমাকে কামড় দিয়ে তার বিষ আমার শরীরে প্রবেশ করাতে পারলনা, অবশেষে সপ্তমবার সে গোস্যা হয়ে খুব জোরে আমাকে কামড় দেয় কিন্তু তার বিষ আমার শরীরে প্রবেশ না করে বরং আমার শরীরের মধ্যে যে আল্লাহ পাক এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মহব্বতের জযবার বিষ ছিল, সেই বিষটা তার শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে, যার ফলে সাপটা নিজেই মরে যায়। (সুবহানাল্লাহ)
রমাদ্বান-১৪১২, চৈত্র-১৩৯৮, এপ্রিল-১৯৯২ ঈসায়ী
হযরত মা আমিনা আলাইহাস সালাম উনার রওজা শরীফ মুবারক জিয়ারত
হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে, একবার হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আম্মার কবর জিয়ারত করতে গেলেন, তখন তিনি নিজে কাঁদলেন আর উনার চতুর্দিকের লোকদেরকে কাঁদালেন, অতঃপর বললেন, আমি আমার প্রতিপালকের নিকট উনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য অনুমতি চেয়েছিলাম কিন্তু তিনি (আল্লাহ পাক) আমাকে উহার অনুমতি দিলেন না। অতঃপর আমি উনার কবর জিয়ারত করার অনুমতি চাইলাম আর আমাকে উহার অনুুমতি দেওয়া হল। সুতরাং তোমরা কবর সমূহ জিয়ারত করবে। কেননা উহা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়। (মুসলিম শরীফ)
“হে প্রশান্ত নফ্স, আপনি প্রসন্ন ও সন্তুষ্টচিত্তে নিজ প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন”
প্রত্যেক চন্দ্রমাস, একজন আরব মেহমানের ছুরতে হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট দেখা করত এবং মাসের মধ্যে ভাল-মন্দ কি ঘটনা ঘটবে তা উনাকে জানাত। হিজরী ৫৬০ সালের রমজান মাসে এসে উনাকে বিদায় সম্ভাষন জানিয়ে গেল। অর্থ্যাৎ পরবর্তী রমজান মাস পর্যন্ত তিনি এই নশ্বর দুনিয়ায় থাকবেন না।
বেহেজাতুল আসরার নামক কিতাবে হযরত শায়খ শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়াদ্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি ৫৬০ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাস হতে কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। তাশারেখে আওলিয়া নামক কিতাবে শায়খ আব্দুল ফতেহ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, রবিবার দিবাগত রাত্রে অর্থ্যাৎ সোমবার রাত্রে হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি গোসল করেন। গোসলান্তে এশার নামাজ পড়ে তিনি উম্মতে মুহম্মদীগণের গুনাহখাতা মাফের জন্য ও তাদের উপর খাছ রহমতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর গায়েব হতে আওয়াজ আসল, “হে প্রশান্ত নফ্স, আপনি প্রসন্ন ও সন্তুষ্টচিত্তে নিজ প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। আপনি আমার নেক্কার বান্দার মধ্যে শামিল হয়ে যান এবং বেহেশ্তে প্রবেশ করেন”। এরপর তিনি কালিমা পাঠ করিয়া তাআজ্জাজা (অর্থ বিজয়ী হওয়া) উচ্চারণ করতে লাগলেন। এবং তিনি আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ বললেন। ইহার পর জিহ¡া তালুর সাথে লেগে গেল। এই ভাবে ৫৬১ হিজরীর (১১১৬ খৃঃ) ১১ই রবিউস্সানী মাসে মাহবুবে সোবহানী, কুতুবে রব্বানী হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি আল্লাহ পাক উনার মহান দরবারে প্রত্যাবর্তন করলেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)।
হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি ক্রমান্বয়ে চারটি বিবাহ করেছিলেন। উনাকে বিবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশে বিবাহ করেছেন। উনার মোট ৪৯ জন সন্তান সন্ততি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৭ জন পুত্র সন্তান এবং ২২ জন মেয়ে সস্তান ছিলেন। উনারা সকলেই অতি উঁচু দরজার অলি আল্লাহ ছিলেন। তাঁদের অনেক বড় বড় সন্মানিত উপাধি ছিল।
রবিউস সানী-১৪১২, কার্তিক-১৩৯৮, অক্টোবর-নভেম্বর-১৯৯১ ঈসায়ী
গাউসুল আজম হযরত বড় পীর সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রিয়াজত
তিনি হযরত শায়খ আবুল খায়ের হামদান বিন মোছলেম দাব্বান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবারে আসা-যাওয়া করতে লাগলেন এবং কঠোর রিয়াজতের মাধ্যমে তাসাউফ শিক্ষায় নিমগ্ন হলেন। হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেন, তিনি দীর্ঘ পচিঁশ বৎসরকাল ইরাকের নির্জন বন-জঙ্গলে, মাঠে-প্রান্তরে এবং ভগ্ন প্রায় বাড়ী-ঘরে কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি যখন ইরাকের জঙ্গলে সাধনা বা রিয়াজত করতাম তখন একদা আমার খুব পানির তৃষ্ণা পেলো, এমন সময় আল্লাহ পাক উনার কুদরতে আকাশে ঘন কালো মেঘের ছায়া নেমে এলো এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই বৃষ্টি আরম্ভ হল। আমি তৃপ্তিভরে পানি পান করলাম। এরপর আকাশে একটা আলোকপাত দেখা দিলো, যা সমস্ত আকাশকে আলোকিত করে ফেললো। অতঃপর ঐ আলোকপিন্ড হতে আওয়াজ এলো- হে আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আমি আপনার আল্লাহ। আমি আপনার ইবাদত বন্দিগীতে সন্তুষ্ট হইয়া সমস্ত হারাম গুলিকে আপনার জন্য হালাল করিয়া দিলাম। ইহা ইবলিশের ধোকাবাজি বা প্রতারনা বুঝতে পেরে সাথে সাথে পড়লেন, “হে বিতাড়িত শয়তান! দূর হয়ে যা এখান থেকে”। এই অকেয়া দ্বারা বুঝা যায়, হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কত বড় সুক্ষ্মদর্শী ছিলেন। কারন যাহা হারাম হওয়ার তাহা হারাম হিসাবে সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। আর যাহা হালাল হওয়ার তাহা হালাল হিসাবেই সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে।
রবিউস সানী-১৪১২, কার্তিক-১৩৯৮, অক্টোবর-নভেম্বর-১৯৯১ ঈসায়ী
গাউসুল আজম হযরত বড় পীড় সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বয়স মোবারক যখন প্রায় আঠার বৎসর ছিল
একবার লোকেরা বড়পীর গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কে জিজ্ঞেস করল, হুযূর আপনি কি মোজাদ্দেদে জামান? তিনি বললেন, হ্যাঁ । তারপর বলা হল, আপনি কি সুলতানুল আরেফীন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবার বলা হল, আপনি কি কুতুবুল আলম? তিনি বললেন হ্যাঁ। তখন সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল। তিনি বললেন, আরও প্রশ্ন কর। তোমরা যা বলবে আমি তারও উপরে, তারও উপরে, তারও উপরে। তোমাদের মধ্যে অনেক লোক আছে, আমি যে মাকামে অবস্থান করি, তারা তার কোন খবরই রাখেনা। যে সমস্ত মাকামগুলির বর্ণনা পরবর্তীতে হযরত মোজাদ্দিদে আলফেসানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মকতুবাত শরীফে উল্লেখ করেছেন।
মোটকথা নবী রসুল আলাইহিমুস সালাম গণের পর একজন মানুষের পক্ষে যত মাকাম অর্জন করা সম্ভব আল্লাহ পাক গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কে তা দিয়েছেন। এটা সুত্যিই উনার জন্য এক বিশেষ মর্যাদা (বলা হয়ে থাকে আল্লাহ পাক উনার এমন অলি কমই অতিবাহিত হয়েছেন, যাঁরা গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রূহানী তাওয়াজ্জুহ বা নেছবত হাসিল করেন নাই)
গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বয়স মোবারক যখন প্রায় আঠার বৎসর ছিল, তখন একবার তিনি আরাফার দিবসে গরু নিয়া নিজের জমি চাষ করতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় সেই গরুটি উনার দিকে ফিরে বলল-
يا عبد القادر- ما بهاذا خلقت وما بهاذا امرت
অর্থঃ হে আব্দুল কাদির রহমতুল্লাহি আলাইহি, এই কাজের জন্য আপনাকে সৃষ্টি করা হয় নাই। এবং এই কাজের জন্য আপনাকে আদেশ করা হয় নাই। এই ঘটনায় তিনি ভয় পেয়ে বাড়িতে ফিরে গেলেন। এতদিন পর্যন্ত স্থানীয় মক্তবে যা কিছু শিখেছিলেন তার চেয়েও অনেক বেশী কিছু শিক্ষার জন্য তিনি বাগদাদ যেতে মনস্থ করলেন। (তিনি মাতৃগর্ভ থেকে অধিকাংশ মতে আঠার পারার হাফিজ হয়েই জন্ম গ্রহণ করেন। অতঃপর অতি শৈষবেই পূর্ণ কুরআন শরীফ হিফজ্ করেন)
রবিউস সানী-১৪১২, কার্তিক-১৩৯৮, অক্টোবর-নভেম্বর-১৯৯১ ঈসায়ী
হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আপেল ফল খাওয়া
প্রত্যেক হিজরী শতকের প্রথমে আল্লাহ পাক এই উম্মতের জন্য এমন লোক প্রেরণ করবেন, যিনি দ্বীনের সংস্কার করবেন, বেদাত বেশরা এবং শরীয়ত বিগর্হীত কাজগুলোর সংশোধন করবেন। সেই রকম একজন খাস ও বিশিষ্ট অলী উল্লাহ হলেন গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ৪৭০ কিংবা ৪৭১ হিজরীতে পবিত্র জ্জিলান নগরে জন্মগ্রহণ করেন। জ্জিলান নগরীটি তৎকালে ইরানে অবস্থিত ছিল। বিখ্যাত অলী আল্লাহ হযরত জোনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্বন্ধে জানা যায় যে, তিনি একদিন মোরাকাবার হালতে ছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, “উনার কদম আমার গর্দানের উপর”। এই বলে তিনি ঘাড় নত করলেন। লোকেরা কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ৫০০ হিজরীতে হযরত আব্দুল কাদির নামে একজন বিখ্যাত ওলী আল্লাহ জন্ম গ্রহণ করবেন। উনার উপাদি হবে মুহিউদ্দীন। আল্লাহ পাক উনার হুকুমে তিনি বলবেন, “সকল অলীগণের গর্দানের উপর আমার কদম”।
মূলতঃ বড়পীর গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মর্যাদা মর্তবা এত বেশী যে, এই বিষয়ে আমরা যদি একটু চিন্তা করি তবে দেখতে পাবো তিনি পিতার দিক থেকে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং মাতার দিক থেকে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর বংশধর। উনার বুযুর্গ পিতা এবং মাতা সাহেবানীর আমল আখলাক ও জীবন সম্পর্কে পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবো যে, সত্যিই উনারা গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাতাপিতা হবার উপযোগী। উনার পিতার পবিত্র নাম সৈয়দ আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি। (যেহেতু তিনি যুদ্ধ প্রিয় ছিলেন সেহেতু উনাকে জঙ্গী দোস্ত বলা হয়) এবং তার মাতার পবিত্র নাম উম্মুল খায়ের আমাতুল জাব্বার ফাতিমা রহমতুল্লাহি আলাইহি। হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন যুবক ছিলেন, তখন একদিন তিনি ক্ষুধার্ত অবস্থায় দজলা নদীর তীর দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন দজলা নদীর মধ্যে একটি ছেব ফল ভাসমান অবস্থায় দেখে ক্ষুধার তাড়নায় খেয়ে ফেললেন। তিনি রাত্রে বিছানায় শুয়ে চিন্তা করতে লাগলেন ছেব ফল খাওয়া কতটুকু জায়েজ হল। (যদিও শরীয়তের মাসয়ালা হল কোন ব্যক্তি যদি ৩ দিন না খেয়ে থাকে তাহার জন্য জরুরত আন্দাজ হারাম খাওয়া জায়েজ) এথেকেই বুঝা যায় যে উনারা হালাল খাদ্যের প্রতি কতটা দৃঢ় ও মজবুত ছিলেন। কেননা এক পয়সা হারাম খেলে চল্লিশ দিন ইবাদত কবুল হয়না। কুরআন শরীফে আল্লাহ পাক বলেন,
يا يها الناس كلوا مما فى الاض حلالاطيبا ولا تتبعوا خطوات الشيطان ط انه لكم عدو مبين (১৭৮ البقره)
অর্থঃ “হে ইনসানেরা তোমরা জমিনে হালাল খাদ্য খাও আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করোনা। নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”।
অতঃপর হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি পরদিন সকালে দজলা নদীর তীর দিয়ে হাটতে লাগলেন, যেদিক থেকে ছেব ফলটি ভেসে আসছিল। কিছুদূর যাবার পর তিনি দেখলেন, নদীর কিনারায় একটি ছেব ফলের বাগান। বাগানের একটি গাছের একটি ডালা ফলসহ নদীর উপর ঝুলন্ত অবস্থায়। আর তার কিছুফল পানিতে ভেসে আছে। তখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে, নিশ্চই আমি এই গাছেরই ফল খেয়েছি। অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের বাড়ীতে গেলেন। বাড়ীতে গিয়ে উনার সাথে বাগানের মালীর সহিত দেখা হয়। মালী উনাকে অপেক্ষা করার জন্য বলে বাগানের মালিককে সংবাদ দেয়। কিছুক্ষণ পর বাগানের মালিক হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি সেখানে এসে উপস্থিত হলে হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, হুযূর আমি না বলে আপনার বাগানের একটি ছেব ফল ক্ষুধার তাড়নায় নদীতে ভাসমান অবস্থায় পেয়ে খেয়ে ফেলেছি। এখন আমি তার মূল্য পরিশোধ করতে এসেছি। একথা শুনার পর হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি আশ্চার্য্য হলেন এবং মনে মনে ভাবলেন, কত লোকইতো আমার বাগানের কত ফল খেয়েছে কিন্তু কেউই এ পর্যন্ত দাম দিতে আসেনি। নিশ্চয়ই এ যুবক একজন আল্লাহ পাক উনার অলি হবেন। বাগানের মালিক জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নিকট কত দেরহাম আছে। উত্তরে হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, দেরহাম থাকলেতো আপনার ফলই খেতাম না। পুণরায় জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কি দিয়ে মূল্য পরিশোধ করবেন? হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, আপনার বাগানে কাজ করে ফলের মূল্য পরিশোধ করতে চাই। বাগানের মালিক হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, বেশ কাজ করতে থাকুন।
অনেকদিন কাজ করার পর হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি কে বললেন, হুযূর আমার ফলের মূল্য কি এখনও পরিশোধ হয় নাই? হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, হ্যাঁ হয়েছে। তবে আর একটি শর্তে তোমাকে মুক্তি দিতে পারি। হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, কি আপনার শর্ত? হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, আমার একটি মেয়ে আছে তাকে বিয়ে করতে হবে। মেয়েটি অন্ধ, বোবা, বধির, খঞ্জ, লুলা, কালো ও কুৎসিত। শুনে হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি ভাবলেন, এ ধরনের একটি মেয়েকে বিয়ে করবো! যার কাছ থেকে খেদমত পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো তাকেই খেদমত করতে হবে। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলেন, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, কাজেই এখন যদি তিনি ক্ষমা না করেন (বিবাহ করা ব্যতিত) তবে আল্লাহ পাক উনার কাছে কি জবাব দিব ইত্যাদি চিন্তা করে রাজী হয়ে গেলেন। বিয়ে হয়ে গেল। হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বাসর ঘরে প্রবেশ করেই (হযরত আব্দুল্লাহ সাওমায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি যা বলেছেন তার বিপরীত দেখতে পেয়েই) তাড়াহুড়া করে ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। ঘর থেকে বের হয়েই দেখলেন, সন্মুখের রাস্তায় (ঘরের সামনে একটি ছোট রাস্তা ছিল) হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি কে। বললেন, হুযূর আপনি যা বলছিলেন এখন দেখি তার বিপরীত। হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন (যা তিনি পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন এমন কিছু ঘটবে) বাবা এই তোমার স্ত্রী। রাত কাটাও। সকালে তোমার প্রশ্নের জবাব দেব।
পরদিন হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি কে বললেন, বাবা- আমার মেয়েকে আমি অন্ধ বলেছি এই জন্যে, আমার মেয়ে কখনও কোন পর পুরুষকে দেখেনি; বোবা বলেছি এজন্যে- সে কখনও কোন পাপের কথা মুখে আনেনি; বধির বলেছি এজন্যে- সে কখনও পাপের কথা কানে শুনেনি; খঞ্জ ও লুলা বলেছি এজন্যে- সে কখনও কোন পাপের পথে পা বাড়ায়নি এবং কোন পাপ কাজ স্পর্ষ করেনি; কালো ও কুৎসিত এজন্যে বলেছি- তাকে কখনও কোন পর পুরুষ দেখেনি। এই কথা শুনে হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি আল্লাহ পাক উনার শোকরগুজার করলেন। এখানে ফিকিরের বিষয়, কেমন নেককার ও পরহেজগার মোত্তাকী পিতা ও মাতার ঘরে অলিয়ে মাদারজাত গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি জন্ম গ্রহন করেন।
রবিউস সানী-১৪১২, কার্তিক-১৩৯৮, অক্টোবর-নভেম্বর-১৯৯১ ঈসায়ী
কাশফূল গুয়ুব নামক কিতাবে হযরত বড়পীর সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী
নিশ্চয় যারা আল্লাহ পাক উনার ওলী উনারা চিন্তা, পেরেশানী এবং ভয়ভীতি থেকে মুক্ত। বড়পীর হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্পর্কে পূর্ববর্তী আওলিয়া-ই-কিরামগণ ভবিষ্যতবানী করে গেছেন। আওলাদে রসুল এবং আহলে বাইতের অন্তর্ভূক্ত হযরত ইমাম জাফর সাদিক রহমতুল্লাহি আলাইহি (যিনি হযরত ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পীর সাহেব ছিলেন) তিনি উনার কাশফূল গুয়ুব নামক কিতাবে বড়পীর হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন ১৪৮ হিজরীর ১১ই রজব জুম্মার রাত্রে আমি যথারীতি কুরআন শরীফ তিলওয়াত ও যিকির আযকার করে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে স্বপে¦ দেখতে পাই, আমি আলমে নাসুথ থেকে (পৃথিবী হতে) উর্ধারোহন করে আলমে মালাকুত এবং আলমে মালাকুত থেকে আলমে জাবারুতে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে এক বিশাল ময়দান দেখতে পেলাম। সেই ময়দানের এক পার্শ্বে মারোয়ারী পাথরের একটা তাবু টাঙানো। সেখান থেকে আল্লাহ পাক উনার রসুল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আমার কাছে এসে বললেন, “হে ইমাম জাফর সাদিক রহমতুল্লাহি আলাইহি, আল্লাহ পাক উনার রসুল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে ডাকছেন। আমি সাথে সাথে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট গেলাম। দেখলাম সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম ও আওলিয়া-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু গণের পবিত্র রূহ মোবারক সেখানে উপস্থিত আছেন। এবং সমস্ত ফিরিশতা কাতারবন্দী হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। একটা খুব সুন্দর আসনের মধ্যে আল্লাহ পাক উনার রসুল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম বসা অবস্থায় আছেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেখা মাত্র বসার জন্য ইশারা করলেন। আমি বসলাম। বিছুক্ষনের মধ্যে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম উনার পার্শ্বে এসে বসলেন। ইত্যবসরে দেখা গেল দু’টি রূহ মোবারক এসে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম উনার ডান জানু মোবারক ও বাম জানু মোবারকে বসলেন। বসার পর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, “হে ইমাম জাফর সাদেক রহমতুল্লাহি আলাইহি আজ থেকে তিনদিন পর তুমি আমার কাছে চলে আসবে। আমি চাই তুমি আলমে জাবারুতের অবস্থা দর্শন করে তা আলমে নাসূতের মধ্যে লিপিবদ্ধ করে আস। একথা বলার পর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি কি জান এ রূহ দু’টি কার? আমার ডান জানু মোবারকে যার রূহ মোবারক দেখতে পেলে তিনি আমার থেকে পাঁচশত বৎসর পর পৃথিবীতে আগমন করবেন। তিনি হলেন গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং আমার বাম জানু মোবারকে যে রূহটি আছেন তিনি হলেন, হযরত আলী আহম্মদ সাবের কালিয়ারী রহমতুল্লাহি আলাইহি। আল্লাহ পাক উনার এ দুই খাস মকবুল বান্দা দ্বারা ইসলামের অনেক খিদমত নিবেন। তারপর পার্শ্বে বসে থাকা অবস্থায় হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দ্বয়কে বললেন, “তোমাদের শাহাদাতের পর আমি আমার উম্মতের কথা ভেবে চিন্তিত হই। তখন আল্লাহ পাক উনার এই দুই মাহবুব বান্দা দ্বারা আমাকে সুসংবাদ দান করেন। হযরত ইমাম জাফর সাদেক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি উক্ত স্বপ¦ দেখার পর ঘুম থেকে জেগে উঠলাম এবং সকালে উঠে কাশফুল গুয়ুব কিতাবে তা লিপিবদ্ধ করলাম।” এই কাশফুল গয়ুব কিতাব তিনি ইন্তিকালের পূর্বেই লিখেছিলেন এবং সত্যিই তিনি তিনদিন পরেই ইন্তিকাল করেন।
রবিউস সানী-১৪১২, কার্তিক-১৩৯৮, অক্টোবর-নভেম্বর-১৯৯১ ঈসায়ী
“ওহে মালেক! তুমি কেন তওবা করছ না?”
হযরত মালেক দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি দামেশ্ক নগরীর একজন ধনী অধিবাসী ছিলেন। তিনি হযরত মোয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুউনার নির্মিত দামেশ্ক জামে মসজিদে এক বৎসরকাল এ উদ্দেশ্যে এতেকাফ করেছিলেন যে, যদি তিনি সেখানে ইবাদতে মশগুল থাকেন তবে সকলে বিশ্বাস করে উনাকে সে মসজিদ সংলগ্ন সম্পত্তির মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করবেন। এ আশায় বশীভূত হয়ে তিনি সর্বক্ষণ নামাজে ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন। অথচ মনে মনে নিজকে মোনাফেক এবং কপট বলেই জানতেন। এরূপে এক বৎসরকাল অতিবাহিত হয়। একদা রাত্রে তিনি মসজিদ হতে বের হয়ে শুনতে পেলেন, যেন কেহ বলছেন- “ওহে মালেক! তুমি কেন তওবা করছ না?” হযরত মালেক দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি ইহা শুনে বিচলিত হলেন ও ভাবতে লাগলেন এক বৎসরকাল কপটভাবে ইবাদত করেছি। ভক্তি ও ইখলাছের সাথে কিছুই করলাম না, এ অনুতাপ করতে করতে সে রাত্রি হতে পবিত্র ও সরল অন্তকরণে আল্লাহ পাক উনার ইবাদতে মশগুল হলেন। পরদিন প্রাতে মুসল্লিগণ মসজিদে এসে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন, মসজিদে বড়ই বিশৃঙ্খলা ঘটছে। একজন উপযুক্ত মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করা হলে মসজিদের কাজ সুচারূপে সম্পন্ন হবে। মালেক ব্যতীত আমরা অন্য কাকেও এ কাজের উপযুক্ত পাত্র মনে করি না। অতঃপর সকলে একমত হয়ে হযরত মালেক দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খেদমতে উপস্থিত হলো এবং মোতাওয়াল্লীর পদ গ্রহণ করতে উনাকে অনুরোধ করলো। হযরত মালেক দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি মনে মনে বলতে লাগলেন- হে খোদা তাআলা! এক বৎসরকাল মোনাফেকের মত ইবাদত করেছি, কিন্তু কাকেও আমার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত পর্যন্ত করতে দেখিনি। আর একটি মাত্র রাত্র সরল মনে (ইখলাছের সাথে) ইবাদতে মশগুল ছিলাম বলে তুমি মোতাওয়াল্লীর পদ প্রদানের জন্য কতিপয় ব্যক্তিকে আমার নিকট পাঠিয়েছ। আমি তোমার রহমতের কসম (শপথ) করে বলছি, এখন আমার সে আকাঙ্খা আর নেই। এ বলে তৎক্ষনাৎ তিনি মসজিদ হতে বের হয়ে পড়লেন এবং মোতাওয়াল্লীর পদ গ্রহণে অসম্মত হয়ে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন।
হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সামনে দুই ব্যক্তির ঝগড়া
একদিন দুই ব্যক্তি নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সামনে ঝগড়া করছিল। আমরা উনার খিদমতে উপবিষ্ট ছিলাম। তাদের একজন ক্রোধান্বিত হয়ে অন্যজনকে গালি দিচ্ছিল। তার মুখমন্ডল রক্তিম হয়ে উঠল। হুযূর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আমি একটি বাক্য জানি। এ ব্যক্তি ওটা পাঠ করলে যা দ্বারা সে আক্রান্ত হয়েছে নিশ্চয়ই তা দূর হয়ে যাবে। সে শুধু বলিবে:
আল্লামা ইবনে কাসীর লিখিয়াছেন- অধিকাংশ ফকীহর মতে “আউজু” পাঠ করা ফরজ বা অপরিহার্য নহে বরং ইহা মুস্তাহাব। ইমাম রাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন- আতা ইবনে আবু রিবাহর মতে নামাজের ভিতরে ও বাহিরে কোরআন মজীদ তিলাওয়াতের পূর্বে আউজু ওয়াজিব। ইবনে সীরিন বলিয়াছেন- জীবনে একবার “আউজু” পাঠ করলেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। আতা ইবনে আবু রিবাহর পক্ষে ইমাম রাজী নিম্নোক্ত দলীল পেশ করেন-
فاذا فرات قران فاستعذبالله من الشيطان الرجيم
উক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ পাক কোরআন শরীফ পাঠের সময় আউজু পাঠ করার জন্য আদেশ করছেন। আদিষ্ট কাজ স্পষ্টতই ওয়াজিব। ইহার সপক্ষে তিনি হুযূর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কার্যধারাও প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন। হুযূর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিলাওয়াতের পূর্বে সর্বদা আউজু পড়তেন। অধিকন্তু উহা দ্বারা শয়তানের কুমন্ত্রনা ও প্ররোচনা প্রতিহত হয়। মূলতঃ যে কাজের সহায়তা ব্যতীত ওয়াজিব সম্পন্ন হতে পারে না তাও ওয়াজিব। সুতরাং আউজু পাঠ করা ওয়াজিব। উহা ওয়াজিব হবার আরও একটি কারণ এই যে, উহা শয়তানের প্ররোচনা হতে রক্ষা করে। কোন বিষয় ওয়াজিব হবার ইহাও একটি পূর্বশর্ত।
কেহ কেহ বলেন ‘আউজু’ পাঠ শুধু হুযূর পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য ওয়াজিব ছিল। উনার উম্মতের উপর ওয়াজিব নহে। ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি ফরজ নামাজে তা আউজু পড়তেন না। তিনি শুধু রমজানের প্রথম রজনীতে সুন্নত (তারাবী) নামাজে তা আউজ পড়তেন। ইমাম শাফেঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে লিখেছেন মুসল্লীরা সরবে তাআউজ পড়বে তবে নীরবে পড়লে ক্ষতি নেই। তিনি উনার কিতাবে বলেন, উহা উচ্চ কি অনুচ্চ যে কোন স্বরে পড়লেই চলবে কারণ হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অনুচ্চ স্বরে ও হযরত আবু বকর সিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উচ্চ স্বরে পড়তেন।
ইমাম শাফেঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রথম রাকাআত ভিন্ন অন্যান্য রাকাআতে তাআউজ পাঠ করাকে মুস্তাহাব বলেন কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদলের মতে তিনি মুস্তাহাব বলেন। অন্যদলের মতে তিনি মুস্তাহাব বলেন না। শেষোক্ত মতই সবল।
ইমাম শাফেঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তাআউজ পাঠে-
اعوذ بالله من الشيطان الرجيم
বললেই চলবে।
ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নামাজে যে তাআউজ পড়ার বিধান রয়েছে, উহা কোরআন শরীফের তিলাওয়াতের কারণে প্রদত্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে ইমাম আবু ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন- উক্ত বিধান নামাজের কারণে প্রদত্ত হয়েছে। তাই ইমাম আবু ইউসুফ বলেন, মোক্তাদী নামাজে কিরাআত পড়বেনা বটে, তাআউজ পড়বে। তেমনি ঈদের নামাজে তাকবীরে তাহরীমার পরও অতিরিক্ত তাকবীরের পূর্বে তাআউজ পড়বে। পক্ষান্তরে তাকবীরের পর তাআউজ পড়তে হবে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১ম খন্ড)
হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাহাদত মুবারক
অনেকে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাহাদত উপলক্ষে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও অন্য অনেক সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগনকে দোষারোপ করে থাকে যা আদৌ সঠিক নয় বরং এটা কুফরী। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ করা হয়- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত মোয়াফা ইবনে ইমরান রহমতুল্লাহি আলাইহি তারা দু’জন বিশ্ব বিখ্যাত বুজুর্গ ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন আমিরুল মোমেনীন ফিল হাদীস। অর্থাৎ হাদীস শাস্ত্রে যিনি আমিরুল মোমেনীন, উনাকে জিজ্ঞেস করা হল, “হুযূর, হযরত মুয়বিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুউনার মর্যাদা বেশী না হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমতুল্লাহি আলাইহিউনার মর্যাদা বেশী। তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং উনার সঙ্গী যিনি ছিলেন তিনি বললেন যে, দেখ হযরত মুয়বিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে জেহাদে যেতেন তখন উনার ঘোড়ার পায়ের দাপটের জন্য যে ধুলাগুলি ঘোড়ার নাকে প্রবেশ করতো সে ধুলাগুলিও হযরত ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। (সুবহানাল্লাহ) তিনি আরও বললেন যে, হযরত আলাইহিস সালাম মর্যাদা বেশী না হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মর্যাদা বেশী? জবাবে বলা হল- হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম তো নবী, তার সাথে কোন তুলনাই হয়না।
তদ্রুপ সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের সাথে পরবর্তী উম্মতদের কোন তুলনাই হয়না। উনাদের সাথে কোন তুলনা করা আদবের খেলাপ। তাই আল্লাহ পাক কোরআন কারীমায় এরশাদ ফরমান- “নিশ্চয়ই যারা আমাকে এবং আমার রাসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়, তাদের ইহকাল এবং পরকালে লানত এবং তাদের জন্য লাঞ্চিত শাস্তি রয়ে গেছে। বুখারী শরীফের একটা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে- আল্লাহ পাককে ভয় কর আল্লাহ পাককে ভয় কর আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের ব্যাপারে। আমার পরে তাঁদেরকে তিরস্কারের লক্ষ্যস্থল করোনা। তাঁদেরকে যারা মহব্বত করল তারা আমাকে মহব্বত করার কারণেই করল। তাঁদেরকে যারা কষ্ট দিল তারা আমাকেই কষ্ট দিল। আর যারা আমাকে কষ্ট দিল তারা আল্লাহ পাককেই কষ্ট দিল। আর যারা আল্লাহ পাককে কষ্ট দিল তাদেরকে আল্লাহ পাক পাকড়াও করবেন। মেশকাত শরীফের একটা হদীসে উল্লেখ করা হয় “যে আমার (হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার) সাহাব-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগনের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করে সে কাফির। আল্লাহ পাক বলেন, একমাত্র কাফিররাই সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ সম্পর্কে বিদ্বেষ করে।
উপরোক্ত কোরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা বুঝা যায় যে, সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ সম্পর্কে বিদ্বেষ পোষন করা কুফরী।