৭৬৬ নং- সুওয়াল : যাকাত কে কে গ্রহণ করতে পারে? কাদেরকে যাকাত দেয়া উত্তম? জানাবেন।

 


সুওয়াল : যাকাত কে কে গ্রহণ করতে পারে? কাদেরকে যাকাত দেয়া উত্তম? জানাবেন।

 জাওয়াব : যাকাত কাদেরকে দিতে হবে, এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন,

انما الصداقات للفقراء والمساكين والعملين عليها والمؤلفة قلوبهم وفى الرقاب والغرمين و فى سبيل الله وابن السبيل فربضة من الله والله عليم حكيم.

অর্থ : নিশ্চয়ই সদ্কা তথা যাকাত ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, নও মুসলিম, গোলামদের আযাদকার্য্য, ঋণগ্রস্থ, জ্বিহাদে লিপ্ত ব্যক্তি এবং মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ পাক সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা তওবা/৬০)

মূলত এ আয়াত শরীফের দ্বারাই যাকাত প্রদানের খাত ৮টি, তা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।

আর যেহেতু যাকাত প্রদানের সব খাতগুলি একই সাথে পাওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু যে কোন একটি খাতে যাকাত প্রদান করলেই যাকাত আদায় হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য যে, বর্তমানে যেহেতু দেশে খেলাফত কায়েম নেই। যাকাত বায়তুল মালেও জমা দেয়া হচ্ছে না এবং কুরআন শরীফে উল্লেখিত সর্ব প্রকার খাতও পাওয়া যাচ্ছে না। আর অনেক যাকাত দাতার গরীব আত্মীয়-স্বজন ও গরীব প্রতিবেশী রয়েছে এবং অনেক মাদ্রাসা রয়েছে যাতে এতিমখানাও আছে। তাই যাকাত দেয়ার সহজ ও উত্তম পদ্ধতি হলো- যাকাতের মালকে তিনভাগ করে একভাগ গরীব আত্মীয়, একভাগ গরীব প্রতিবেশী ও একভাগ মাদ্রাসার এতিমখানায় প্রদান করা।

আর যদি গরীব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী না থাকে, তবে সবটাই মাদ্রাসার এতিমখানায় দেয়া আফযল ও উত্তম।

হ্যাঁ, এ তিন প্রকার ব্যতীত যদি কুরআন শরীফে উল্লেখিত যাকাতের হক্বদারদের মধ্যে আরো কাউকে পাওয়া যায়, তবে তাদেরকেও যাকাত দিয়ে কুরআন শরীফের উপর আমল করা উত্তম।

আবা-৪২

 

 

৭৬৫ নং- সুওয়াল : যাকাত কার উপর ওয়াজিব?




সুওয়াল : যাকাত কার উপর ওয়াজিব?

জাওয়াব : যারা মালেকে নেছাব বা ছাহেবে নেছাব, তাদের উপর যাকাত ফরজ। আর মালেকে নেছাব বা ছাহেবে নেছাব বলতে বুঝায় যে মুসলমান স্বাধীন, বালেগ বা বালেগার নিকট হাওয়াজে আছলীয়াহ (নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, মাল-সামানা) বাদ দিয়ে কর্জ ব্যতীত নিজ মালিকানাধীনে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রৌপ্য বা তার সমপরিমাণ মূল্য পূর্ণ এক বছর থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত ফর

আবা-৪২

৭৬৪ নং- সুওয়াল : ঈদের নামাজের পূর্বে কোন নফল ইবাদত বা পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা যাবে কি?

 

সুওয়াল : ঈদের নামাজের পূর্বে কোন নফল ইবাদত বা পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা যাবে কি?

জাওয়াব : ঈদের নামাজের পূর্বে পুরুষ, মহিলা প্রত্যেকের জন্য নফল নামাজ আদায়, পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত ইত্যাদি মাকরূহ। (মারাকিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী, তাতারখানিয়া)

আবা-৪২

৭৬৩ নং- সুওয়াল : ঈদের দিনের সুন্নতসমূহ কি? জানালে কৃতার্থ হবো।

 


সুওয়াল : ঈদের দিনের সুন্নতসমূহ কি? জানালে কৃতার্থ হবো।

জাওয়াব : ঈদের দিনের সুন্নত হলো- (১) খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা, (২) গোসল করা, (৩) মিস্ওয়াক করা, (৪) সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, (৫) আতর ব্যবহার করা, (৬) নামাজের পূর্বে সদকাতুল ফিৎরা আদায় করা, (৭) ঈদুল ফিত্র নামাজের পূর্বে কিছু মিষ্টান্ন খাওয়া (৮) তিন, পাঁচ বা বেজোড় সংখ্যক খেজুর বা খুরমা খাওয়া, (৯) মহল্লার (এলাকার) মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়া, (১০) ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া, (১১) এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা, (১২) সকাল সকাল ঈদের নামাজ পড়ার জন্য যাওয়া, (১৩) ঈদের নামাজ, ঈদগাহে গিয়ে পড়া। সম্ভব না হলে মহল্লার (এলাকার) মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়া, (১৪) আস্তে আস্তে নিম্নলিখিত দোয়া পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া

الله اكبر الله اكبر لا اله الا الله والله اكبر الله اكبر ولله الحمد.

(১৫) শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে খুশী প্রকাশ করা ইত্যাদি ঈদের সুন্নত। (আলমগীরী, নূরুল ইজা ও অন্যান্য ফিক্বাহ্রে কিতাব)

৭৬২ নং- সুওয়াল : নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ঈদের নামাজ কখন পড়তেন?

 


সুওয়াল : নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ঈদের নামাজ কখন পড়তেন?

জাওয়াব : নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ঈদের নামাজ সূর্য উদয় হওয়ার পর অর্থাৎ ইশরাক শুরু হওয়ার সময়েই পড়তেন, দেরী করতেন না। তবে ঈদুল ফিত্র নামাজ তুলনামূলক একটু দেরী করে পড়ে নিতেন এবং ঈদুল আয্হার নামাজ সময় হওয়ার সাথে সাথেই  আদায় করে নিতেন।     

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে, হযরত জুনদুব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে ঈদুল ফিত্রের নামা পড়াতেন সূর্য দুনেযা পরিমাণ উদয়ের পর। আর ঈদুল আয্হার নামাজ পড়াতেন এক নেযা পরিমাণ উদয়ের পর।এর অর্থ হলো- সূর্য উদয়ের নিষিদ্ধ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর পরই নামাজ পড়ে নিতেন।

ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, “আমাদের মদীনাবাসী আলেমগণকে দেখেছি, তাঁরা সূর্যোদয়ের পর পরই ঈদের নামাজের জন্য যেতেন।” (মুদাওওয়ানাতুল কুবরা, মেশকাত, মেরকাত, শরহুত্ ত্বীবী, তালীকুছ ছবীহ্, লুময়াত)

আবা-৪২

৭৬১ নং- সুওয়াল : ঈদের রাতের ফযীলত কি?

 


সুওয়াল : ঈদের রাতের ফযীলত কি?

জাওয়াব : বছরে পাঁচ রাতে দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়। তার মধ্যে দুঈদের দুরাত। এ রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত-বন্দেগী, তাছবীহ পাঠ, পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, দরূদ শরীফ ও যিকির-আয্কার করে রাত অতিবাহিত করা অতি উত্তম। দিলের নেক মকসুদসমূহ আল্লাহ পাক উনার নিকট জানালে আল্লাহ পাক তা কবুল করবেন।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আয্হার রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদতে মশগুল থাকবে, যেদিন অন্য সমস্ত দিল মরবে, সেদিন তার দিল মরবে না।এর অর্থ হলো- ক্বিয়ামতের দিন অন্যান্য দিল পেরেশানীতে থাকলেও দুঈদের রাতে জাগরনকারী ব্যক্তির দিল শান্তিতে থাকবে। (তীবরানী শরীফ)

আবা-৪২

৭৬০ নং- সুওয়াল : এ বছর সদকাতুল ফিতর কত?

 


সুওয়াল : এ বছর সদকাতুল ফিত কত?

জাওয়াব : নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদাকতুল ফিতরেরর পরিমাণ সম্পর্কে ইরশাদ মুবারক করেন,

صاع من بر على كل اثنين.

অর্থ : প্রতি দুজনের জন্য এক সাঅর্থাৎ একজনের জন্য অর্ধ সা” (আবূ দাউদ, বযলুল মাজহুদ)

আমাদের হানাফী মায্হাব মোতাবেক অর্ধ সাবলতে এক সের সাড়ে বার ছটাক বুঝানো হয়েছে, যা গ্রাম হিসাবে ১৬৫৭ গ্রাম (প্রায়) হয়। কাজেই যাদের উপর সদ্কাতুল ফিত্র ওয়াজিব অর্থাৎ ঈদের দিন সুব্হে সাদিকের সময় নেসাব পরিমাণ (সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সমপরিমাণ টাকা) সম্পদ থাকে, তাদের প্রত্যেক্যেই উল্লেখিত একসের সাড়ে বার ছটাক বা ১৬৫৭ গ্রাম আটা বা তার মূল্য দান করতে হবে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আটার দাম বিভিন্ন রকম। কাজেই যাদের উপর সদ্কাতুল ফিত্র ওয়াজিব, তাদেরকে তাদের নিজ নিজ এলাকার বর্তমান মূল্য হিসাবে একসের সাড়ে বার ছটাক বা ১৬৫৭ গ্রাম আটার মূল্য দিতে হবে।

এ বছর ঢাকা শহরে ১৫.০০ টাকা কেজি হিসাবে একসের সাড়ে বার ছটাক বা ১৬৫৭ গ্রাম আটার মূল্য- ২৪.৮৬ টাকা (প্রায়)। এর কম দেয়া যাবেনা, তবে ইচ্ছা করলে বেশী দিতে পারবে।

আবা-৪২

৭৫৯ নং- সুওয়াল : মাসিক রহ্মানী পয়গাম জানুয়ারী/৯৭ এবং মাসিক আত-তাওহীদ ডিসেম্বর’ ৯৬/জানুয়ারী’ ৯৭ সংখ্যা পত্রিকার প্রচ্ছদে মসজিদের ছবি ছাপানোর সাথে সাথে মানুষের ছবিও ছাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এ রকম মানুষের ছবি ছাপানোও কি নাজায়েয হবে?

 


সুওয়াল : মাসিক রহ্মানী পয়গাম জানুয়ারী/৯৭ এবং মাসিক আত-তাওহীদ ডিসেম্বর৯৬/জানুয়ারী৯৭ সংখ্যা পত্রিকার প্রচ্ছদে মসজিদের ছবি ছাপানোর সাথে সাথে মানুষের ছবিও ছাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এ রকম মানুষের ছবি ছাপানোও কি নাজায়েয হবে?

জাওয়াব : মানুষ তথা প্রাণীর ছবি তোলা, আাঁকা, ছাপা ইত্যাদি সবই হারাম ও নাজায়েয। হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে,

ان اشد الناس عذابا يوم القيامة المصورون.

অর্থ : ক্বিয়ামতের দিন ঐ সকল মানুষের কঠিন শাস্তি হবে যারা ছবি তোলে, আঁকে ও ছাপে।” (বোখারী শরীফ, ফতহুল বারী, শরহে আইনী, কিরমানী)

অতএব, মাসিক রাহ্মানী পয়গাম ও আত্-তাওহীদ পত্রিকার প্রচ্ছদে মানুষের ছবি ছাপিয়ে তারা হারাম ও নাজায়েয কাজ করেছে।

উল্লেখ্য, যদি তারা হারাম জেনে উক্ত ছবি ছাপিয়ে থাকে, তবে তারা চরম ফাসেকী কাজ করেছে। আর যদি হালাল জেনে ছাপিয়ে থাকে, তবে তারা কুফরী করেছে।

শরীয়তের ফায়সালা হলো- হারামকে হালাল, এবং হালালকে হারাম জানা বা মনে করা উভয়ই কুফরী। সুতরাং যারা কুফরী করবে, তাদের জীবনের সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তাদের স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে এবং হজ্ব করে থাকলে তা বাতিল হয়ে যাবে। অতএব তাদের উচিৎ খালেছ তাওবা করা। (বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাযাহ্, মেশকাত, দায়লামী, মসনদে আহমদ, ফতহুল বারী, উমদাতুল কারী, মোযাহেরে হক্ব, হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা, কিতাবুল ফিক্বাহ্ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, মাশারিকুল আনওয়ার, আযজাওয়াজির আল একতেরাফিল কাবায়ের, ফতওয়ায়ে নঈমিয়া, তুহ্ফায়ে খাওয়াতিন, বাহ্রে শরীয়ত, এরশাদুত্ ত্বলেবীন, ফতওয়ায়ে সিদ্দিকিয়া, ইমদাদুল ফতওয়া)

[বিঃ দ্রঃ- প্রাণীর ছবি ও তা ছাপানো হারাম হওয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে আমাদের প্রকাশিত মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম সংখ্যা পাঠ করুন, যাতে ৩৫৩টি নির্ভরযোগ্য দলীল পেশ করা হয়েছে।]

৭৫৮ নং- সুওয়াল : মাসিক মদীনা জানুয়ারী ’৯৭ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তরটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। আমরা আপনাদের আল বাইয়্যিনাতের সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে তার সঠিক ফায়সালা দিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন করার জন্য অনুরোধ করছি।  প্রশ্ন : তবলীগের লোকেরা বলতেছে, দাওয়াত দেয়া এখন ফরযে আইন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোজাহেদরা বলতেছে জেহাদ করা ফরযে আইন হয়ে দাড়িয়েছে, কোনটা ঠিক?



সুওয়াল : মাসিক মদীনা জানুয়ারী ৯৭ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তরটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। আমরা আপনাদের আল বাইয়্যিনাতের সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে তার সঠিক ফায়সালা দিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন করার জন্য অনুরোধ করছি।

প্রশ্ন : তবলীগের লোকেরা বলতেছে, দাওয়াত দেয়া এখন ফরযে আইন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোজাহেদরা বলতেছে জেহাদ করা ফরযে আইন হয়ে দাড়িয়েছে, কোনটা ঠিক?

উত্তর : উভয়ই ঠিক কথা বলতেছেন। দাওয়াত দেয়া স্ব-স্ব সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলমানেরই দায়িত্ব। তেমনি জেহাদের ডাক আসলে তাতে যোগ দেওয়াও মুসলমানের দায়িত্ব। এটা তেমনি যেমন নামায পড়া ফরয। আবার বছরান্তে মালের যাকাত দেওয়াও ফরয। দাওয়াত এবং জেহাদ একটা আর একটির পরিপূরক। একটি ছাড়া আর একটি পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনা। একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে যে, প্রত্যেক মোজাহিদই একএকজন দাওয়াতকর্মী। কারণ জেহাদর অর্থই হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার দ্বীনের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, দ্বীনের মর্যাদা রক্ষা বা বৃদ্ধি কল্পে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা। অপর পক্ষে মহান আল্লাহ পাক উনার দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে প্রতিকূল পরিবেশে যাওয়ার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, অনেক সংঘাত সংঘর্ষের মোকাবেলা করতে হয় এর নামও তো জেহাদ।

জাওয়াব : মাসিক মদীনার দাওয়াত ও জ্বিহাদ ফরজে আইন হওয়া সংক্রান্ত উক্ত উত্তর সম্পূর্ণ অশুদ্ধ ও জেহালতপূর্ণ হয়েছে। আর এরূপ অশুদ্ধ ও জেহালতপূর্ণ উত্তর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ফিৎনা সৃষ্টি করে।

দাওয়াত ও জ্বিহাদ ক্ষেত্র ও ব্যক্তিবিশেষে ফরজে আইন, ফরজে কেফায়া ও হারাম। ফরজে আইন হচ্ছে এমন ইবাদত, যা প্রত্যেক ব্যক্তিকেই আলাদাভাবে ফরজ হিসেবে পালন করতে হয়। যেমন-নামা, রোজা ইত্যাদি।

আর ফরজে কেফায়া হচ্ছে এমন ইবাদত, যা প্রত্যেক ব্যক্তিকেই আলাদাভাবে আদায় করতে হয়না। কেউ বা কিছু লোক আদায় করে নিলেই সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়। যেমন- জানাযার নামাজ পড়া, আলেম হওয়া, হাফেজ হওয়া ইত্যাদি।

মুসলমানদের সমষ্টিগত কাজসমূহ যে ফরজে কেফায়া, সে প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন,

ما كان المؤمنون لينفروا كافة.

অর্থ : মুমিনদের জন্য উচিৎ হবেনা যে, তাদের একসাথে কোন কাজে বের হওয়া।” (পবিত্র সূরা তওবা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১২২)

ইমাম-মুজতাহিদগণ এ পবিত্র আয়াত শরীফ হতে উসুল বের করেছেন যে, মুমিনদের জন্য সম্মিলিতভাবে কোন কাজ করা ফরজে আইন নয় বরং তা ফরজে কেফায়ার অন্তর্ভূক্ত। দাওয়াত হচ্ছে এমন একটি ইবাদত, যা ক্ষেত্র ও ব্যক্তিবিশেষে ফরজে আইন, ফরজে কেফায়া ও হারাম। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তি যে তার পরিবারের প্রধান, তার জন্য নিজ পরিবারভূক্ত বা অধীনস্থদেরকে আল্লাহ পাক উনার প্রতি দাওয়াত বা আহ্বান করা অর্থাৎ তাকীদ বা উৎসাহ দিয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার মতে মত ও মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম,  হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পথে থাকার জন্য কোশেশ করা ফরজে আইন।

আর এর জন্য উক্ত পরিবারের প্রধানের বিশেষ কোন যোগ্যতার প্রয়োজন নেই।

আর আম বা ব্যাপকভাবে দাওয়াত প্রদান করা ফরজে আইন নয়, বরং তা ফরজে কেফায়ার অন্তর্ভূক্ত এবং এ দাওয়াত প্রদান করার জন্য শর্ত হচ্ছে- হক্কানী-রব্বানী আলেম হওয়া, যা হক্কানী-রব্বানী আলেম হওয়া ব্যতীত কোন পরিবারের প্রধানের জন্যও হারাম।

আর যারা সাধারণ লোক (হক্কানী-রব্বানী আলেমও নয় বা কোন পরিবার, গোষ্ঠী বা সমষ্টির প্রধান নয়) তাদের জন্য উভয় প্রকার দাওয়াত দেয়া সম্পূর্ণ হারাম।

উল্লেখ্য, দাওয়াতের মত জ্বিহাদও একটি ইবাদত, যা সাধারণতঃ ফরজে কেফায়ার অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু ক্ষেত্র বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তা ফরজে আইন ও হারাম হয়ে থাকে।

জ্বিহাদ দুপ্রকার-  (১) জ্বিহাদে আসগর (ছোট জ্বিহাদ), (২) জ্বিহাদে আকবর (বড় জ্বিহাদ)।

জ্বিহাদে আকবর হচ্ছে- নফসের জ্বিহাদ, যা সর্বাবস্থায় প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য করতে হয়- ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।

এই জ্বিহাদ সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে- মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণকে নিয়ে তাবুকের জ্বিহাদ হতে ফেরার পথে ইরশাদ মুবারক করেন,

رجعنا من الجهاد الاصغر الى الجهاد الاكبر.

অর্থ : আমরা ছোট জ্বিহাদ থেকে বড় জ্বিহাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম।

কাজেই নফসের জ্বিহাদ যেমনি ঘরে নিরিবিলি বসে থেকে করতে হয়, তেমনি জ্বিহাদের ময়দানেও করতে হয়। অর্থাৎ জ্বিহাদের ময়দানে তরবারী বা যুদ্ধাস্ত্র পরিচালনা করবে, তা আল্লাহ পাক উনার জন্য, না গায়রুল্লাহ জন্য? অথবা অন্যের সাথে মুয়ামেলাত-মুয়াশেরাত করবে, কিম্বা নিজে নিজের জন্য কোন কিছু করবে, তা নফসের তাড়নায়, না আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির জন্য?

মূলত জ্বিহাদে আকবর, সাধারণভাবে সকলের জন্যই সর্বাবস্থায় ফরজে আইন। কিন্তু জ্বিহাদে আসগরকে ফরজে আইন বলা সম্পূর্ণরূপে বিভ্রান্তি মূলক ও গোমরাহীপূর্ণ।

মহান আল্লাহ পাক উনার কালেমাকে বুলন্দ করতে গিয়ে মুসলমান ও কাফেরদের মাঝে যে যুদ্ধ হয়, তাকে জ্বিহাদে আসগর বলে।

সাধারণতঃ প্রত্যেক মুসলমান দেশে, দেশ রক্ষা করার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্যবাহীনি থাকে। যদি কোন বিধর্মী দেশের সৈন্যরা মুসলমান দেশের উপর আক্রমণ করে, তাহলে তাদেরকে প্রতিহত করার দায়িত্ব সৈন্যবাহীনির উপর। তখনও সাধারণভাবে জ্বিহাদ ফরজে আইন হবেনা।

মহান আল্লাহ পাক না করুন যদি মুসলমান সৈন্যবাহিনী পরাস্ত হয়, তাহলে বিধর্মী সৈন্য যে এলাকা দিয়ে মুসলমান দেশে প্রবেশ করবে, সে এলাকার লোকেদের জন্য জ্বিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়। আল্লাহ পাক না করুন অতঃপর সে এলাকার লোকেরাও যদি পরাস্ত হয় এবং ব্যাপকভাবে বিধর্মী সৈন্যরা মুসলমান দেশে প্রবেশ করতে থাকে, তাহলে পর্যায়ক্রমে নিকটবর্তী এবং পরবর্তীতে সমস্ত মুসলমান পুরুষের উপর জ্বিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়। আল্লাহ পাক না করুন মুসলমান পুরুষরাও যদি পরাস্ত হয়ে যায়, তাহলে মহিলাদের উপরও জ্বিহাদ ফরজে আইন হয়ে যাবে।

আর যদি জ্বিহাদ বলতে বর্তমান প্রচলিত গণতান্ত্রিক ভিত্তিক আন্দোলনকে বুঝানো হয়, তাহলে এ আন্দোলন করা ফরজে আইন বা ফরজে কেফায়া কোনটা তো নয়ই, বরং এ আন্দোলন ইসলাম ও জ্বিহাদের নামে করা হারাম বা কুফুরীর অন্তর্র্ভূক্ত, যা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফর-ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত।

মূলত সাধারণভাবে দাওয়াত ও জ্বিহাদ কোনটাই ফরজে আইন নয়। যারা ফরজে আইন বলে থাকে, তারা ভুল ও বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।

আবা-৪২

৭৫৭ নং- সুওয়াল : মাসিক মদীনা জানুয়ারী/৯৭ সংখ্যায় নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপানো হয়।-  প্রশ্ন : আমি যদি কোন ইসলামী দলে যোগদান করে আন্দোলনে শরীক হই এবং সংঘর্ষে মুসলমানদের হাতেই মারা যাই, তবে কি আমি শহীদ বলে বিবেচিত হবো?

 


সুওয়াল : মাসিক মদীনা জানুয়ারী/৯৭ সংখ্যায় নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপানো হয়।-

প্রশ্ন : আমি যদি কোন ইসলামী দলে যোগদান করে আন্দোলনে শরীক হই এবং সংঘর্ষে মুসলমানদের হাতেই মারা যাই, তবে কি আমি শহীদ বলে বিবেচিত হবো?

উত্তর : মহান আল্লাহ পাক উনার দ্বীনের সম্মান রক্ষা বা বর্ধন করার লক্ষ্যে যদি সংগ্রাম করেন, এবং সংঘর্ষে নিহত হন তবে অবশ্যই আপনি শহীদরূপে মর্যাদা পাবেন। হত্যাকারী যদি মুসলমান নামধারীও হয়, তাতেও কিছু যায় আসেনা। স্মরণীয় যে, ইসলামের স্বার্থে সংগ্রামরত ব্যক্তিকে হত্যা করলে পরে সে হত্যাকারী আর মুসলমান থাকেনা।

এখন আমার সুওয়াল হলো- বর্তমান প্রেক্ষাপটে মদীনা সম্পাদকের প্রদত্ত উত্তর ঠিক হয়েছি কি?

 

জাওয়াব : বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাসিক মদীনার উপরোক্ত উত্তর শুদ্ধ হয়নি।

কারণ প্রশ্নকারী তার প্রশ্নে উল্লেখ করেছে, সে যদি কোন ইসলামী দলে যোগদান করে এবং তাদের আন্দোলনে শরীক হয় এবং সে আন্দোলনে যদি সে মারা যায়, তবে কি সে শহীদ হবে কিনা? কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে যে, ইসলামী দল বলতে বর্তমানে যে সব দল সমূহকে বোঝায়, সেগুলি একটিও প্রকৃতপক্ষে ইসলামসম্মত নয়। বরং সেসব দলসমূহ হাক্বীক্বতে ইসলামের নামে কলঙ্ক। কারণ ইসলামী দল বললেও তারা আসলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিরই অনুসারী এবং গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যনুযায়ীই অন্যান্য দলের ন্যায় তারা দল গঠন করেছে। আবার অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ন্যায়ই মিছিল-মিটিং, ভাংচুর, হরতাল, অবরোধ, অসহযোগ করে তারা আন্দোলন করে। আর করতে গিয়ে যে সংঘর্ষ হয়, তাতে তাদের কেউ কেউ মারাও যায়। এছাড়া প্রতিপক্ষের সাথে কোন্দলের কারণেও সংঘর্ষে তাদের কেউ কেউ মারা যায়। অথচ এসব কাজকেই তারা ইসলামী আন্দোলন নাম দিয়ে থাকে।

কাজেই স্পষ্টতঃই বোঝা যাচ্ছে যে, উপরোক্ত আন্দোলন, সংগ্রাম বা সংঘর্ষে যদি কেউ মারা যায়, তবে সে ইসলামের উপর থেকে মারা যায়না। কারণ ইসলামে গণতান্ত্রিক রাজনীতি হারাম। কাজেই সে পদ্ধতির প্রতিবাদ, আন্দোলন, সংগ্রাম, সংঘর্ষ হারাম এবং তা হচ্ছে- মূলতঃ ইহুদী, খ্রীষ্টান, হিন্দু তথা বিধর্মীদের রাজনৈতিক রীতি বা তার ফসল। অথচ ইসলাম পরিপূর্ণ ধর্ম। আল্লাহ পাক বলেন,

من يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخاسرين.

অর্থ : যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম বা নিয়ম-নীতি তালাশ করে, তার থেকে তা গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (পবিত্র সূরা ইমরান শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৮৫)

কাজেই গণতান্ত্রিক নিয়ম-নীতিতে কেউ তথাকথিত ইসলামী আন্দোলন করতে গিয়ে মারা গেলে, তার সে মৃত্যু আদৌ ইসলামকে বুলন্দ করার জন্য বলে বিবেচিত তো হবেইনা বরং ইসলামের খেলাফ বিধর্মীদের পক্ষে হওয়ায় তা কুফরী বলেই গণ্য হবে।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, ইসলামের কোন বিষয়কে প্রতিষ্ঠা বা বুলন্দ করার জন্য যদি কেউ মারা যায়, তবে সে সংঘর্ষে মারা গিয়েছে, তা বলা জায়েয হবেনা। তাকে বলতে হবে জ্বিহাদ। আর সংঘর্ষ তাকেই বলে, যেখানে কোন ইসলামী বিষয় বা উদ্দেশ্য থাকেনা বরং স্বার্থান্বেষী উদ্দেশ্যেই দুদল তাতে লিপ্ত হয় ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কাজেই এসব সংঘর্ষ ও তথাকথিত ইসলামী দলে যোগদান করে কেউ মারা গেলে সে শহীদ হবেনা।

আবা-৪২