ছিহাহ ছিত্তার ইমামগন কোন মাযহাব অনুসরন করতেন ?
Image result for মাযহাবছিহাহ ছিত্তার ইমামগন কোন মাযহাব অনুসরন করতেন ?
উনারা সকলেই কোন না কোন সম্মানিত মাযহাব উনার ইমামদের তাক্বলীদ করতেন। মাযহাব যদি শির্ক - বিদ'আত হয় তাহলে ছিহাহ ছিত্তা সহ অন্যান্য হাদিসের ইমামগণ কি মুশরিক, বিদ'আতী ছিলেন? নাউজু বিল্লাহি মিন যালিক।
এ পর্যায়ে রেফারেন্স সহ হাদিসের ইমামগণের মাজহাব তুলে ধরা হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হল লামাজহাবীদের প্রথম কাতারের নেতা নবাব ছিদ্দীক হাসান খান সবিস্তারে হাদিসের ইমামগণের মাজহাব তার লিখিত বইয়ে বর্ণনা করেছেন।
১। ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি শাফেয়ী মাজহাব উনার অনুসারী ছিলেন।

সুত্রঃ নবাব ছিদ্দিক হাসান খান লিখিত আবজাদুল উলুম পৃষ্ঠা নং ৮১০, আলহিত্তা পৃষ্ঠা নং ২৮৩।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখিত আল-ইনসাফ পৃষ্ঠা নং ৬৭।
আল্লামা তাজ উদ্দীন সুবকী রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখিত ত্ববকাতুশ শাফেয়ী পৃষ্ঠা নং ২/২।
২। ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি শাফেয়ী মাজহাব উনার অনুসারী ছিলেন।
সুত্রঃ ছিদ্দিক হাঃ খান লিখিত আল-হিত্তা পৃষ্ঠা নং ২২৮।
৩। ইমাম তিরমিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজে মুজতাহিদ ছিলেন। তবে হানাফী ও হাম্বলী মাজহাবের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।
সুত্রঃ শা ওয়ালিউল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখিত আল-ইনসাফ পৃষ্ঠা নং ৭৯।
৪। ইমাম নাসাঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি শাফেয়ী মাজহাব উনার অনুসারী ছিলেন।
সুত্রঃ নবাব ছিদ্দিক হাসান খান লিখিত আল-হিত্তা পৃষ্ঠা নং ২৯৩।
৫। ইমাম আবুদাউদ রহমতুল্লাহি আলাইহি শাফেয়ী মাযহাব উনার অনুসারী ছিলেন ।
সুত্রঃ নবাব ছিদ্দিক হাসান খান লিখিত আল-হিত্তা পৃষ্ঠা নং ২২৮।
আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহঃ ইবনে তাইমিয়ার উদ্দৃতি দিয়ে ফয়জুল বারী ১/৫৮ তে ইমাম আবুদাউদ রহঃকে হাম্বলী বলে উল্যেখ করেছেন।
৬। ইমাম ইবনে মাজাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি শাফেয়ী মাজহাব উনার অনুসারী ছিলেন।
সুত্রঃ ফয়জুলবারী ১/৫৮।
এ গেল ছিহাহ ছিত্তার ইমামগণ উনাদের মাজহাব।
অন্যান্য ইমামগণের মাজহাব নবাব ছিদ্দীক হাসান খানর আল-হিত্তা থেকে।
৭। মিশকাত শরিফ প্রণেতা, সাফেয়ী , পৃঃ১৩৫
৮। ইমাম খাত্তাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি্‌ শাফেয়ী, পৃঃ ১৩৫
৯। ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি ,শাফেয়ী, পৃঃ ১৩৫
১০। ইমাম বাগভী রহমতুল্লাহি আলাইহি্‌ শাফেয়ী, পৃঃ ১৩৮
১১। ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাম্বলী, পৃঃ১৩৫
১২। বড় পীর ,আবদুল কাদের জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি , হাম্বলী, পৃঃ ৩০০
১৩।ইবনে তাইমিয়া ,হাম্বলী, পৃঃ ১৬৮

১৪। ইবনে কায়্যিম রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাম্বলী, পৃঃ১৬৮
১৫। ইমাম আবদুল বার রহমতুল্লাহি আলাইহি , মালেকী, পৃঃ১৩৫
১৬। ইমাম আবদুল হক্ব মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি , হানাফী, পৃঃ১৬০
১৭। শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি , হানাফী, পৃঃ ১৬০-১৬৩
১৮। ইমাম ইবনে বাত্তাল মালেকী, পৃঃ২১৩
১৯। ইমাম হালাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি্‌ , হানাফী পৃঃ২১৩
২০। ইমাম শামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুদদায়েম রহমতুল্লাহি আলাইহি , শাফেয়ী, পৃঃ২১৫
২১। ইমাম বদরুদ্দীন আঈনী রহমতুল্লাহি আলাইহি , হানাফী, পৃঃ২১৬
২২। ইমাম যারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি , শাফেয়ী, পৃঃ ২১৭
২৩। ইমাম ক্বাজী মুহিব্বুদ্দীন ,হাম্বলী, পৃঃ ২১৮
২৪। ইমাম ইবনে রজব ,হাম্বলী, পৃঃ২১৯
২৫। ইমাম বুলকিনী্‌ ,শাফেয়ী, পৃঃ ২১৯
২৬। ইমাম মার্যুকী্‌ ,মালেকী পৃঃ ২২০
২৭। ইমাম জালালুদ্দীন বকরী ,শাফেয়ী, পৃঃ২২০
২৮। ইমাম কুস্তলানী ,শাফেয়ী, পৃঃ২২২
২৯। ইমাম ইবনে আরাবী ,মা,লেকী, পৃঃ ২২৪
এমন কি তাদের মডেল আব্দুল ওয়াহ্হাব নজদীকে ও হাম্বলী বলে উল্লেখ করেছে তার আল্-হিত্তাতু ফিস সিহাহিস সিত্তাহ'র ১৬৭ পৃষ্ঠায়।
এখন কি তাহলে উল্লেখিত ইমাম, মণীষীদেরকে মাজহাব মানার কারণে বর্জন করতে হবে?
মাজহাব কি ?

Image result for মাযহাব














মাজহাব কি ?
মুজতাহিদ হল কুরআন সুন্নাহ, সাহাবাদের ফাতওয়া, কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের ঐক্যমত্বে এবং যুক্তির নিরিখে কুরআন সুন্নাহ থেকে মাসআলা বেরকারী গবেষক দলের নাম। যারা নিষ্ঠার সাথে বিভিন্ন মূলনীতি নির্ধারণ করে কুরআন সুন্নাহর বাহ্যিক বিপরীতমুখী মাসআলার মাঝে সামাঞ্জস্যতা এনেছেন। কুরআন সুন্নাহর একাধিক অর্থবোধক শব্দের নির্ধারিত পালনীয় অর্থকে নির্ধারিত করে দিয়েছেন। নতুন উদ্ভূত মাসআলার শরয়ী মূলনীতির আলোকে সমাধান বরে করেছেন। সেই সাথে নতুন নতুন মাসআলার কোন মূলনীতির আলোকে হুকুম আরোপিত হবে যার বিধান সরাসরি কুরআন সুন্নাহে বর্ণিত নেই, সেই মূলনীতিও নির্ধারিত করেছেন। মূলত সেই গবেষক দলের নাম হল মুজতাহিদ। আর তাদের উদ্ভাবিত মূলনীতির আলোকে বের হওয়া মাসআলার নাম মাযহাব।
মাযহাব কেন ?

মাযহাব পালনের কথা এই জন্য বলা হয় যে, যেহেতু কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে আলেম খুবই নগণ্য। যারাও আছে তারা কুরআনে কারীমের কোন আয়াতের হুকুম রহিত হয়ে গেছে, কোন আয়াতের হুকুম বহাল আছে, কোন আয়াত কোন প্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছে, কোন আয়াত কাদের উদ্দেশ্য করে নাজিল হয়েছে। কোন আয়াতাংশের প্রকৃত অর্থ কি? আরবী ব্যাকরণের কোন নীতিতে পড়েছে এই বাক্যটি? এই আয়াত বা হাদীসে কী কী অলংকারশাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে? ইত্যাদী সম্পর্কে বিজ্ঞ হন না। সেই সাথে কোনটি সহীহ হাদীস কোনটি দুর্বল হাদীস? কোন হাদীস কি কারণে দুর্বল? কোন হাদীস কী কারণে শক্তিশালী? হাদীসের বর্ণনাকারীদের জীবনী একদম নখদর্পনে থাকা আলেম এখন নাই। অথচ হাদীসের বর্ণনাকারী শক্তিশালী না হলে তার দ্বারা শরয়ী হুকুম প্রমাণিত হয়না। এই সকল বিষয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি পাওয়া যাওয়া দুস্কর। একেতু অধিকাংশ মানুষই আলেম না। আর মুষ্টিমেয় যারা আলেম তারাও উল্লেখিত সকল বিষয় সম্পর্কে প্রাজ্ঞ নয়। তাই আমাদের পক্ষে কুরআন সুন্নাহ থেকে সঠিক মাসআলা বের করা অসম্ভব।

একটি উদাহরণ:

এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ﺍﻗﻴﻤﻮﺍ ﺍﻟﺼﻼﺓ

তথা সালাত কায়েম কর। আরেক আয়াতে বলেছেন-

ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﻣَﻼﺋِﻜَﺘَﻪُ ﻳُﺼَﻠُّﻮﻥَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ

তথা নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা এবং ফেরেস্তারা নবীজীর উপর সালাত পড়ে। এই আয়াতের শেষাংশে এসেছে-

ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺻَﻠُّﻮﺍ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠِّﻤُﻮﺍ ﺗَﺴْﻠِﻴﻤًﺎ

তথা হে মুমিনরা তোমরাও উনার উপর সালাত পড় এবং উনাকেও সালাম জানাও। {সূরা আহযাব-৫৬}

এই সকল স্থানে লক্ষ্য করুন-“সালাত” শব্দটির দিকে। তিনটি স্থানে সালাত এসেছে। এই তিন স্থানের সালাত শব্দের ৪টি অর্থ। প্রথম অংশে সালাত দ্বারা উদ্দেশ্য হল “নামায” অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আমাদের নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা নামায কায়েম কর। {সূরা বাকারা-৪৩}

আর দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ও তার ফেরেস্তারা নবীজী সাঃ এর উপর সালাত পড়েন মানে হল-আল্লাহ তায়ালা হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর রহমত পাঠান, আর ফেরেস্তা আলাইহিমুস সালাম উনারা হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা উপর সালাত পড়েন, মানে হল হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাগফিরাতের দুয়া করেন।

আর তৃতীয় আয়াতাংশে “সালাত” দ্বারা উদ্দেশ্য হল উম্মতরা যেন নবীজী সাঃ এর উপর দরূদ পাঠ করেন।
( ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻜﻠﻴﺎﺕ ـ ﻷﺑﻰ ﺍﻟﺒﻘﺎﺀ ﺍﻟﻜﻔﻮﻣﻰ )

একজন সাধারণ পাঠক বা সাধারণ আলেম এই পার্থক্যের কথা কিভাবে জানবে?

সেতো নামাযের স্থানে বলবে রহমাতের কথা, রহমতের স্থানে বলবে দরূদের কথা, দরূদের স্থানে বলবে নামাযের কথা। এরকম করলে দ্বীন আর দ্বীন থাকবে না, হবে জগাখিচুরী।

এরকম অসংখ্য স্থান আছে, যার অর্থ উদ্ধার করা কঠিন। তাই একজন বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ব্যক্তির শরাপন্ন হয়ে তার গবেষনা অনুযায়ী উক্ত বিষয়ের সমাধান নেয়াটাই হল যৌক্তিক। এই নির্দেশনাই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে দিয়েছেন-

{ ﻓَﺎﺳْﺄَﻟﻮﺍ ﺃَﻫْﻞَ ﺍﻟﺬِّﻛْﺮِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﻻ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ{ ]ﺍﻟﻨﺤﻞ 43: ]

তথা তোমরা না জানলে বিজ্ঞদের কাছে জিজ্ঞেস করে নাও। {সূরা নাহল-৪৩}

বিজ্ঞ ফুক্বাহায়ে কিরাম কুরআন সুন্নাহ, ইজমায়ে উম্মাত, এবং যুক্তির নিরিখে সকল সমস্যার সমাধান বের করেছেন। সেই সকল বিজ্ঞদের অনুসরণ করার নামই হল মাযহাব অনুসরণ। যেই অনুসরণের নির্দেশ সরাসরি আল্লাহ তায়ালা দিলেন পবিত্র কুরআনে।

হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাযহাব কি?

মাযহাব কি এটা নিশ্চয় আগের বক্তব্য দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে। সেই হিসেবে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়াতে কারো মাযহাব অনুসরণের দরকার নাই। কারণ তিনি নিজেইতো শরীয়ত প্রণেতাদের একজন। তিনি কার ব্যাখ্যা গ্রহণ করে অনুসরণ করবেন? তিনি কেবল আল্লাহ তায়ালার থেকেই সমাধান জেনে আমল করেছেন, এবং আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন।

সাহাবীদের মাযহাব কি?

সাহাবায়ে কিরাম যারা সরাসরি হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে ছিলেন তাদের জন্য হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ব্যাখ্যা অনুসরণ করা ছিল আবশ্যক। এছাড়া কারো ব্যাখ্যা নয়। কিন্তু যেই সকল সাহাবারা ছিলেন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে দূরে তারা সেই স্থানের বিজ্ঞ সাহাবীর মাযহাব তথা মত অনুসরণ করতেন। যেমন ইয়ামেনে হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ এর মত তথা মাযহাবের অনুসরণ হত। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাকে অনুসরণ করতেন ইরাকের মানুষ।


হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুয়াজ বিন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাকে ইয়ামানে পাঠাতে মনস্ত করলেন তখন মুয়াজ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাকে জিজ্ঞেস করলেন-“যখন আপনার কাছে বিচারের ভার ন্যস্ত হবে তখন আপনি কিভাবে ফায়সাল করবেন?” তখন তিনি বললেন-“আমি ফায়সালা করব কিতাবুল্লাহ দ্বারা”। হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-“যদি কিতাবুল্লাহ এ না পাও?”

তিনি বললেন-“তাহলে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নাত দ্বারা ফায়সালা করব”। হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-“যদি রাসূলুল্লাহ এর সুন্নাতে না পাও?” তখন তিনি বললেন-“তাহলে আমি ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করব”।


তখন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বুকে চাপড় মেরে বললেন-“যাবতীয় প্রশংসা ঐ আল্লাহর যিনি উনার রাসূলের প্রতিনিধিকে সেই তৌফিক দিয়েছেন যে ব্যাপারে উনার রাসূল সন্তুষ্ট”। {সূনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৩৫৯৪, সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং-১৩২৭, সুনানে দারেমী, হাদিস নং-১৬৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২২০৬১}


এই হাদীসে লক্ষ্য করুন-হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জীবদ্দশায় হযরত মুয়াজ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলছেন যে, আমি কুরআন সুন্নাহে না পেলে নিজ থেকে ইজতিহাদ করব, আল্লাহর নবী বললেন-“আল হামদুলিল্লাহ”। আর ইয়ামেনের লোকদের উপর হযরত মুয়াজের মত তথা মাযহাব অনুসরণ যে আবশ্যক এটাও কিন্তু হাদীস দ্বারা স্পষ্ট। এছাড়া সাহাবাদের যুগে যে সকল সাহাবাদের মাযহাব তথা মত অনুসরণীয় ছিল। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হল-


হযরত ওমর বিন খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আলী বিন আবু তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আয়েশা আলাইহসি সালাম, হযরত জায়েদ বিন সাবেত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রমূখ সাহাবাগণ।

তাবেয়ীদের মাযহাব:

তাবেয়ীরা যেই সকল এলাকায় থাকতেন, সেই সকল এলাকার বিজ্ঞ সাহাবীদের বা বিজ্ঞ মুজতাহিদের মত তথা মাযহাবের অনুসরণ করতেন। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- হযরত সাঈদ বিন মুসায়্যিব রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত আবু সালমা বিন আব্দির রহমান রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ওরওয়া বিন জুবাইর রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত কাসেম বিন মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত সুলাইমান বিন ইয়াসার রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত খারেজা বিন জায়েদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রমূখবৃন্দ। তারপর মদীনায় যাদের মত তথা মাযহাবের অনুসরণ করা হত তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হল-হযরত ইমাম জুহরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত রাবিয়া বিন আব্দির রহমান রহমাতুল্লাহি আলাইহি

আর মক্কা মুকার্রমায় ছিলেন আতা বিন আবি রাবাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আলী বিন আবি তালহা রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আব্দুল মালিক বিন জুরাইজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রমূখ। আর কুফায় ছিলেন হযরত ইবরাহীম নাখয়ী, আমের বিন শুরাহবীল, শা’বী, আলকামা, আল আসওয়াদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি

আর বসরায় ছিলেন-হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ইয়ামানে হযরত তাওস বিন কায়সান রহমাতুল্লাহি আলাইহি। শামে হযরত মাকহুল রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রমূখ। যাদের ফাতওয়া বিধৃত হয়েছে- মুয়াত্তাগুলোতে।, মুসনাদগুলোতে, আর সুনানগুলোতে, যেমন মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, কিতাবুল আসার, শরহু মায়ানিল আসার ইত্যাদী গ্রন্থে। {উসুলুল ইফতা লিত তাক্বী উসমানী দাঃবাঃ}


কুরআন ও হাদীস দেখে আমল করলে অসুবিধা কোথায়?

কি কি অসুবিধা তা আশা করি মাযহাব কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে পেয়ে গেছেন। সেই উত্তরটি আবার দেখে নিন।

মুহাদ্দিসগন কি মাযহাব মেনেছেন?

এই কথাটি বুঝার আগে একটি কথা আগে বুঝে নিন। সেটা হল-হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যুগ থেকেই দু’টি দল চলে আসছে, একটি দল হল যারা ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। তারা ইজতিহাদ করতেন তথা মত দিতেন বিভিন্ন বিষয়ে। আর একদল ছিলেন যাদের এই ক্ষমতা ছিলনা, তারা সেই মুজতাহিদদের মতের তথা মাযহাবের অনুসরণ করতেন। ঠিক একই অবস্থা ছিল সাহাবাদের যুগে। একদল ছিল মুজতাহিদ, যাদের একটি তালিকা ইতোপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। আর বিশাল এক জামাত ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন না। তারা সেই সকল মুজতাহিদদের মাযহাব তথা মতের অনুসরণ করতেন। তেমনি তাবেয়ীদের একই অবস্থা ছিল, একদল মুজতাহিদ, আরেকদল মুকাল্লিদ তথা অনুসারী। এমনি মুহাদ্দিসীনদের মাঝেও দুই দল ছিল, একদল ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন, আরেকদল ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন না। তাই তাদের মাঝে কারো কারো মাযহাব রয়েছে কারো কারো নেই। কেউ কেউ নিজেই মাসআলা বের করেছেন, কেউ কেউ অন্য কোন ইমামের অনুসরণ করেছেন।


যেমন ইমাম বুখারী মুজতাহিদ ছিলেন, তাই তার কারো অনুসরণের দরকার নাই। তবে কেউ কেই তাকে শাফেয়ী মাযহাবী বলে মত ব্যক্ত করেছেন। {আল ইনসাফ=৬৭, তাবাকাতুশ শাফেয়িয়্যাহ-২/২, আবজাদুল উলুম—৮১০}


এমনিভাবে ইমাম মুসলিম রহঃ ছিলেন শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী। {আল হিত্তাহ-১৮৬}


নাসায়ী শরীফের সংকলক ইমাম নাসায়ী রহঃ ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ এর মাযাহাবের অনুসারী ছিলেন।, ইমাম আবু দাউদ রহঃ, ও ছিলেন হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। {ফয়জুল বারী-১/৫৮, আবজাদুল উলুম-৮১০, ইলাউল মুয়াক্কিয়ীন-১/­২৩৬} ইমাম তাহাবী রহঃ ছিলেন হানাফী মাযহাবের অনুসারী। যা তার সংকলিত তাহাবী শরীফ পড়লেই যে কেউ বুঝতে পারবে। এছাড়াও বাকি সকল মুহাদ্দিস হয়ত মুজতাহিদ ছিলেন, নতুবা ছিলেন মুকাল্লিদ কোননা কোন ইমামের।


কেন একটি মাযহাবই মানতে হবে?


কুরআনে কারীম ৭টি কিরাতে নাজীল হয়েছে। কিন্তু একটি কিরাতে প্রচলন করেছেন হযরত উসমান রাঃ। যেটা ছিল আবু আসেম কুফী রহঃ এর কিরাত। এর কারণ ছিল বিশৃংখলা রোধ করা। যেন দ্বীনকে কেউ ছেলেখেলা বানিয়ে না ফেলে। আর সবার জন্য এটা সহজলভ্য হয়। তেমনি একটি মাযহাবকে আবশ্যক বলা হয় এই জন্য যে, একাধিক মাযহাব অনুসরণের অনুমোদন থাকলে সবাই নিজের রিপু পূজারী হয়ে যেত। যেই বিধান যখন ইচ্ছে পালন করত, যেই বিধান যখন ইচেছ ছেড়ে দিত। এর মাধ্যমে মূলত দ্বীন পালন হতনা, বরং নিজের প্রবৃত্তির পূজা হত। তাই ৪র্থ শতাব্দীর উলামায়ে কিরাম একটি মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক বলে এই প্রবৃত্তি পূজার পথকে বন্ধ করে দিয়েছেন। যা সেই কালের ওলামায়ে কিরামের সর্বসম্মত সীদ্ধান্ত ছিল। আর একবার উম্মতের মাঝে ইজমা হয়ে গেলে তা পরবর্তীদের মানা আবশ্যক হয়ে যায়। ইমাম ইবনে তাইমিয়াও লাগামহীনভাবে যে মাযহাব মনে চায় সেটাকে মানা সুষ্পষ্ট হারাম ও অবৈধ ঘোষণা করেন। {ফাতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া-২/২৪১}


বিস্তারিত জানতে দেখুন-


১-তাযাল্লিয়াতে সফদর, মাওলানা মুহাম্মদ আমীন সফদর প্রণীত।


২-মাযহাব মানি কেন? মুফতী রফিকুল ইসলাম আল মাদানী প্রণীত ।


৩-মাযহাব ও তাকলীদ কী ও কেন? শাইখুল ইসলাম তাকী উসমানী প্রণীত।


---------------------------------------------------------


(শেয়ার করে অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিন) —

সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব উনার উপর মউত পর্যন্ত ইস্তিক্বামত থাকা ফরয ( ৪৮ নং )

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব চতুষ্ঠয় উনাদের মধ্যে যে কোন একটি সম্মানিত ও পবিত্র মাযহাব মানা ও অনুসরণ করা ফরয ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া”- পেশ করতে পারায় মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
পূর্ব প্রকাশিতের পর

সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার মধ্যে পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

সম্মানিত ইমাম-মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা সম্মানিত শরীয়ত উনার সঠিক মাসয়ালাগুলো যা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে সুপ্ত বা পুশিদা বা গুপ্ত যা বুঝা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য এবং আওয়ামুন্নাস বা সাধারণ মানুষের জন্য অস্পষ্ট সেগুলো স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করেন। যা পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ সম্মানিত শরীয়ত উনার একাংশ অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মতই অকাট্য দলীল। সুবহানাল্লাহ!
নিম্নে এ সম্পর্কিত কিছু প্রমাণ উল্লেখ করা হলো-
সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা সম্মানিত ইমাম মুজতাহিদ উনারা ক্বিযাস করে ফায়ছালা করেছেন। যার প্রমাণ সরাসরি পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের কোথাও নেই। অথচ সকলেই তা মেনে নিয়েছে ও আমল করছে। এমনকি মাযহাব বা ইজমা-ক্বিয়াস অস্বীকারকারীরাও তা মানে ও আমল করে।
প্রথম প্রমাণ
(১০৬১)
বিখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা উনাদের তাকরীব, তাহযীব, মীযান ও তাদরীব নামক গ্রন্থে পবিত্র হাদীছ শরীফ সংগ্রহকারী মুহাদ্দিছ উনাদের জীবনী মুবারক ও দোষ গুণ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। এতে পূর্ববর্তী আলিম উনাদের বিচারে কাউকে সত্যবাদী, কাউকে মিথ্যাবাদী, কাউকে মেধাবী, কাউকে পাপী ও পথভ্রষ্ট এবং কাউকে অপরিচিত ও প্রতারক বলা হয়েছে। এর দ্বারা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের সত্যাসত্য নির্ণয় করা হয়েছে। এটা মানলে পবিত্র হাদীছ শরীফ অবগত হওয়া সম্ভব হবে। এটা কিন্তু মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের আদেশ নির্দেশ মুবারক নয়। পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে এর নাম নিশানা পর্যন্ত নেই। এটা ইমাম মুজতাহিদ উনাদের ক্বিয়াসী ফায়ছালা। মুসলমান উনারা এ ক্বিয়াসী ফায়ছালার প্রতি বিশ্বাস করে পবিত্র হাদীছ শরীফ মানছেন। একে আসমাউর রিজাল বলে। এখন কেউ যদি এ বিনা দলীলের কথা অমাণ্য করে তবে পবিত্র হাদীছ শরীফ কাকে বলে, তা জানতে পারবে না। আর যদি মান্য করে তাহলে মহান আল্লাহ পাক উনাকে ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে ব্যতীত অন্য কারো মতালম্বন করে কাফির ও মুশরিক হবে কি না?
২য় প্রমাণ
(১০৬২)
পুত্র, মাতা পিতার আদেশ, আহলিয়া (স্ত্রী), আহাল (স্বামী) উনার আদেশ, প্রজা, রাজার আদেশ, গোলাম মুনিবের আদেশ পালন করে থাকে। এতে তারা মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের ব্যতীত অন্যদের আদেশ পালন করে মাযহাব বিরোধীদের মতে তারা কাফির হবে কিনা?
৩য় প্রমাণ
(১০৬৩)
উছূলে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের অবস্থা বর্ণিত আছে। পবিত্র হাদীছে মুতাওয়াতির, মাশহূর, আযীয, গরীব, ছহীহ, হাসান, দ্বয়ীফ, মারফু, মওকুফ, মাকতু, মুরসাল, মুয়াল্লাক, মুনকাতি ইত্যাদি বিবিধ প্রকার পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের কোনটা গ্রহনীয়, কোনটা পরিত্যাজ্য। বিদয়াতী, অপরিচিত, স্মৃতিশক্তি রহিত ব্যক্তিদের বর্ণিত পবিত্র হাদীছ শরীফ ছহীহ হবে কি না? পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের সত্যাসত্য নির্ণয় করতে চাইলে ইহা মান্য করা একান্ত আবশ্যক।
কিন্তু এই বিদ্যার প্রমাণ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে নেই। এটা ইমাম মুজতাহিদ উনাদের ক্বিয়াসী ফায়ছালা ভিন্ন আর কিছুই নয়। এখন যদি কেউ এটা অমান্য করে, তবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাদীছ শরীফ নষ্ট করলো, আর যদি মানে তবে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ ভিন্ন উপরোক্ত আলিম উনাদের তাকলীদ করে কাফির ও মুশরিক হবে কি না?
৪র্থ প্রমাণ
(১০৬৪)
ইমাম বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাযাহ, তিরমিযী, মালিক, আহমদ প্রভৃতি হাদীছ শরীফ উনাদের লিখক ইমামগণের মধ্যে কেউ কেউ প্রথম শ্রেণীর অগ্রগণ্য এবং কেউ কেউ দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত ছিলেন।  উনাদের মধ্যে কেউই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখেননি। সুতরাং উনারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র নুরুছছালাম অর্থাৎ পবিত্র যবান মুবারক থেকে কোন হাদীছ শরীফই শ্রবণ করেননি। কিন্তু উপরোক্ত মুহাদ্দিছগণ নিজ নিজ ক্বিয়াসে যে হাদীছ শরীফকে সত্য বা ভ্রান্তিমূলক বলেছেন এবং যে হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারীকে সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী বলেছেন, তাই মুসলিম জগতের লোক মেনে আসছেন। ছহীহ বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মুয়াত্তা শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, নাসায়ী শরীফকে ছিহাহ সিত্তাহ বলা হয়। এর হাদীছ শরীফ থাকতে অন্যান্য হাদীছ শরীফ গ্রন্থের হাদীছ শরীফ ধর্তব্য হবে না। প্রথমেই ছহীহ বুখারী শরীফ, তারপর ছহীহ মুসলিম শরীফ ইত্যাদি গ্রহণ করতে হয়। এগুলো সমস্তই ক্বিয়াসী কথা। পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে উপরোক্ত মুহাদ্দিছ উনাদের কোনো কথাই বর্ণিত নেই। এক্ষেত্রে কেউ যদি উক্ত হাদীছ বিশরাদগণের বিনা দলীলের উক্তি না মানে, তবে সমস্ত হাদীছ শরীফ বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি মানে তবে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ ভিন্ন অপরের বিনা দলীলের উক্তি মেনে কাফির ও মুশরিক হবে কি না?
৫ম প্রমাণ
(১০৬৫)
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম জারীর তাবারী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি, কাজী বায়যাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার তাফসীর লিখেছেন। যা দ্বারা পবিত্র আয়াত শরীফসমূহ উনাদের নাযিল হওয়ার কারণ, সময় ও প্রকৃত অর্থ বুঝা যায়। এগুলো ব্যতীত পবিত্র কুরআন শরীফ উনার প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করা যায় না। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি ভালভাবে বুঝা যাবে।
১ম উদাহরণ
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-
(১০৬৬)
وَأَنْ تَجْمَعُوْا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ
উনার প্রকৃত আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- দুই সহোদরা বোনকে একত্রিত করা হারাম। কিন্তু এই আভিধানিক অর্থ এর প্রকৃত অর্থ নয়। টিকাকারগণ এর প্রকৃত অর্থ এরূপ লিখেছেন যে, দুই সহোদরা বোনের একজনকে বিবাহ করে তার বর্তমানে অন্য বোনকে বিবাহ করা হারাম।
২য় উদাহরণ
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে আরো উল্লেখ আছে-
(১০৬৭)
فَاَيْنَمَا تُوَلُّوْا فَثَمَّ وَجْهُ اللهِ
অর্থ: তোমরা যে দিকে মুখ ফিরিয়ে নামায পড়ো, মহান আল্লাহ পাক সেদিকেই আছেন। এতে প্রমাণিত হয় নামায পড়ার সময় কা’বা শরীফ উনার দিকে মুখ করার আবশ্যকতা নেই। কিন্তু টিকাকারগণ এর প্রকৃত অর্থ লিখেছেন যে স্থানে থেকে তোমরা কা’বা শরীফ উনার দিকে মুখ করে নামায পড়ো, সে স্থানেই মহান আল্লাহ পাক তোমার নামায কবুল করবেন।
৩য় উদাহরণ
(১০৬৮)
ছলাত শব্দের আভিধানিক অর্থ নিতম্ব, হেলান, যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা লাভ করা, ছওম শব্দের অর্থ নিরস্ত্র হওয়া ও হজ্জ শব্দের অর্থ ইচ্ছা করা। এখানে এটা তার প্রকৃত মর্ম নয়। টিকাকারগণ এর প্রকৃত অর্থ নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত লিখেছেন। এখানে পবিত্র কুরআন শরীফ বুঝতে হলে উক্ত তাফসীরকারক উনাদের মত গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে উনাদের মতামতের অধিকাংশই বর্ণিত হয়নি। তাহলে যারা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ ভিন্ন তাফসীরকারক উনাদের মত অনুসরণ করবে তারা কাফির ও মুশরিক হবে কিনা?
৬ষ্ঠ প্রমাণ
(১০৬৯)
মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে নামায পড়তে, গোলাম আযাদ করতে ও জন্তু শিকার করতে আদেশ মুবারক করেছেন। কিন্তু ইমামগণ প্রথমটিকে ফরয, দ্বিতীয়টিকে মুস্তাহাব ও তৃতীয়টিকে মুবাহ সাব্যস্ত করেছেন। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে এগুলোর স্পষ্ট কোনো মিমাংসা নেই। এক্ষেত্রে কেউ যদি ইমাম উনাদের ফায়ছালা মেনে না নেয়, তাহলে নামাযকে মুস্তাহাব অথবা মোবাহ বলে এবং গোলাম আযাদ এবং পশু শিকার করাকে ফরয বলে গোমরাহ হবে, আর যদি তা স্বীকার করে নেয় তাহলে ইমাম উনাদের মাযহাব মানতে বাধ্য হলো।
৭ম প্রমাণ
(১০৭০)
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ
তোমাদের আহলিয়ারা তোমাদের শষ্যক্ষেত্র। তোমরা যে দিক দিয়ে ইচ্ছা করো ঐ শষ্যক্ষেত্রে গমণ করো।
এই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার স্পষ্ট মর্মানুসারে আহলিয়াদের বড় ইস্তিঞ্জার রাস্তা দিয়ে নির্জনবাস করা সাব্যস্ত হয়। ইমাম উনারা ক্বিয়াস করে এই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার প্রকৃত অর্থ স্থির করেছেন। এখন কেউ যদি ইমাম উনাদের ক্বিয়াসী ব্যবস্থা স্বীকার না করে, তাহলে আহলিয়াদের বড় ইস্তিঞ্জার রাস্তা দিয়ে নির্জনবাস করার ফতওয়া প্রদান করে বিশ্বের মুসলমানদেরকে গোমরাহ করবে। আর যদি ক্বিয়াসী ব্যবস্থা গ্রহণ করে তবে ইমাম উনাদের মাযহাব মেনে কাফির ও মুশরিক হবে কি না?
৮ম প্রমাণ
(১০৭১)
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-
فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهٖ مِنْهُنَّ فَاتُوْهُنَّ أُجُوْرَهُنَّ
আহলিয়াদের (স্ত্রী লোক) সাথে মুতা বিবাহ করে তাদের দেন মোহর পরিশোধ করো।
এই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার অর্থানুসারে মুতা নিকাহ হালাল সাব্যস্ত হয়। এক অথবা দশদিন অথবা নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করে বিবাহ করাকে মুতা বিবাহ বা কন্টাক্ট ম্যারেজ বলা হয়। এইরূপ কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করে নিকাহ করা সম্মানিত শরীয়তে হারাম সাব্যস্ত হয়েছে। ইমাম উনারা ক্বিয়াস করে উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করেছেন। এখন যদি ইমাম উনাদের ক্বিয়াসী ব্যবস্থা অস্বীকার করে তবে মেয়াদী নিকাহ হালাল মনে করে গোমরাহ হবে। আর যদি স্বীকার করে তবে ইমাম উনাদের মাযহাব মানতে বাধ্য হবে।
৯ম প্রমাণ
(১০৭২)
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
فَكُلُوْا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ
অর্থ: যে বস্তুর উপর মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক উচ্চারণ করা হয়েছে তা খাও।
উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার স্পষ্ট মর্মানুসারে প্রত্যেক হালাল, হারাম যে কোনো বস্তু হউক না কেন বিসমিল্লাহ পড়ে খেলে তা হালাল হবে। কিন্তু হযরত ইমাম মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ক্বিয়াস করে এর প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করেছেন। যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
(১০৭৩)
وَلَا تَأْكُلُوْا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ
অর্থ: যে বস্তুর উপর মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক উচ্চারণ করা হয়নি, তা আহার করো না।
উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার স্পষ্ট মর্মানুসারে কোনো খাদ্য সামগ্রী বিসমিল্লাহ না পড়ে খেলে হারাম হবে। কিন্তু ইমাম মুজতাহিদ উনারা নিজ ক্বিয়াসে এর অর্থ অন্যরূপ সরল সত্য মর্ম প্রকাশ করেছেন।
এখন যদি ইমাম মুজতাহিদ উনাদের ক্বিয়াসী ব্যবস্থা অমান্য করে তবে হারাম বস্তুকে হালাল ও হালালকে হারাম বলে কাফির হবে। আর যদি মানে তবে ইমাম মুজতাহিদ উনাদের মাযহাবকে মানতে বাধ্য হবে।
১০ম প্রমাণ
(১০৭৪)
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
وَكَلِمَةُ اللهِ وَرُوْحٌ مِّنْهُ
অর্থ: “হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার বাক্য ও তা হতে একটি রূহ (আত্মা) মুবারক।”
উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার স্পষ্ট অর্থ গ্রহণ করলে আধুনিক খ্রিস্টানী মত সাব্যস্ত হয়। কিন্তু এটা বিভ্রান্তিমূলক অর্থ। ইমাম মুজতাহিদ উনারা ক্বিয়াস করে এর প্রকৃত অর্থ ব্যক্ত করেছেন। এখন যদি ইমাম মুজতাহিদ উনাদের মত না মানে তবে খ্রিষ্টীয় মতাবলম্বী হবে। আর যদি মানে তবে ইমাম উনাদের মাযহাব ধরতে বাধ্য হবে।