হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আপেল ফল খাওয়া

 

হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আপেল ফল খাওয়া 

প্রত্যেক হিজরী শতকের প্রথমে আল্লাহ পাক এই উম্মতের জন্য এমন লোক প্রেরণ করবেন, যিনি দ্বীনের সংস্কার করবেন, বেদাত বেশরা এবং শরীয়ত বিগর্হীত কাজগুলোর সংশোধন করবেন। সেই রকম একজন খাস ও বিশিষ্ট অলী উল্লাহ হলেন গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ৪৭০ কিংবা ৪৭১ হিজরীতে পবিত্র জ্জিলান নগরে জন্মগ্রহণ করেন। জ্জিলান নগরীটি তৎকালে ইরানে অবস্থিত ছিল। বিখ্যাত অলী আল্লাহ হযরত জোনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্বন্ধে জানা যায় যে, তিনি একদিন মোরাকাবার হালতে ছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, “উনার কদম আমার গর্দানের উপর”। এই বলে তিনি ঘাড় নত করলেন। লোকেরা কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ৫০০ হিজরীতে হযরত আব্দুল কাদির নামে একজন বিখ্যাত ওলী আল্লাহ জন্ম গ্রহণ করবেন। উনার উপাদি হবে মুহিউদ্দীন। আল্লাহ পাক উনার হুকুমে তিনি বলবেন, “সকল অলীগণের গর্দানের উপর আমার কদম”।

মূলতঃ বড়পীর গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মর্যাদা মর্তবা এত বেশী যে, এই বিষয়ে আমরা যদি একটু চিন্তা করি তবে দেখতে পাবো তিনি পিতার দিক থেকে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং মাতার দিক থেকে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর বংশধর। উনার বুযুর্গ পিতা এবং মাতা সাহেবানীর আমল আখলাক ও জীবন সম্পর্কে পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবো যে, সত্যিই উনারা গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাতাপিতা হবার উপযোগী। উনার পিতার পবিত্র নাম সৈয়দ আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি। (যেহেতু তিনি যুদ্ধ প্রিয় ছিলেন সেহেতু উনাকে জঙ্গী দোস্ত বলা হয়) এবং তার মাতার পবিত্র নাম উম্মুল খায়ের আমাতুল জাব্বার ফাতিমা রহমতুল্লাহি আলাইহি। হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন যুবক ছিলেন, তখন একদিন তিনি ক্ষুধার্ত অবস্থায় দজলা নদীর তীর দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন দজলা নদীর মধ্যে একটি ছেব ফল ভাসমান অবস্থায় দেখে ক্ষুধার তাড়নায় খেয়ে ফেললেন। তিনি রাত্রে বিছানায় শুয়ে চিন্তা করতে লাগলেন ছেব ফল খাওয়া কতটুকু জায়েজ হল। (যদিও শরীয়তের মাসয়ালা হল কোন ব্যক্তি যদি ৩ দিন না খেয়ে থাকে তাহার জন্য জরুরত আন্দাজ হারাম খাওয়া জায়েজ) এথেকেই বুঝা যায় যে উনারা হালাল খাদ্যের প্রতি কতটা দৃঢ় ও মজবুত ছিলেন। কেননা এক পয়সা হারাম খেলে চল্লিশ দিন ইবাদত কবুল হয়না। কুরআন শরীফে আল্লাহ পাক বলেন,

يا يها الناس كلوا مما فى الاض حلالاطيبا ولا تتبعوا خطوات الشيطان ط انه لكم عدو مبين (১৭৮ البقره)

অর্থঃ “হে ইনসানেরা তোমরা জমিনে হালাল খাদ্য খাও আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করোনা। নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”।

অতঃপর হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি পরদিন সকালে দজলা নদীর তীর দিয়ে হাটতে লাগলেন, যেদিক থেকে ছেব ফলটি ভেসে আসছিল। কিছুদূর যাবার পর তিনি দেখলেন, নদীর কিনারায় একটি ছেব ফলের বাগান। বাগানের একটি গাছের একটি ডালা ফলসহ নদীর উপর ঝুলন্ত অবস্থায়। আর তার কিছুফল পানিতে ভেসে আছে। তখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে, নিশ্চই আমি এই গাছেরই ফল খেয়েছি। অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের বাড়ীতে গেলেন। বাড়ীতে গিয়ে উনার সাথে বাগানের মালীর সহিত দেখা হয়। মালী উনাকে অপেক্ষা করার জন্য বলে বাগানের মালিককে সংবাদ দেয়। কিছুক্ষণ পর বাগানের মালিক হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি সেখানে এসে উপস্থিত হলে হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, হুযূর আমি না বলে আপনার বাগানের একটি ছেব ফল ক্ষুধার তাড়নায় নদীতে ভাসমান অবস্থায় পেয়ে খেয়ে ফেলেছি। এখন আমি তার মূল্য পরিশোধ করতে এসেছি। একথা শুনার পর হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি আশ্চার্য্য হলেন এবং মনে মনে ভাবলেন, কত লোকইতো আমার বাগানের কত ফল খেয়েছে কিন্তু কেউই এ পর্যন্ত দাম দিতে আসেনি। নিশ্চয়ই এ যুবক একজন আল্লাহ পাক উনার অলি হবেন। বাগানের মালিক জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নিকট কত দেরহাম আছে। উত্তরে হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, দেরহাম থাকলেতো আপনার ফলই খেতাম না। পুণরায় জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কি দিয়ে মূল্য পরিশোধ করবেন? হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, আপনার বাগানে কাজ করে ফলের মূল্য পরিশোধ করতে চাই। বাগানের মালিক হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, বেশ কাজ করতে থাকুন।

অনেকদিন কাজ করার পর হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি কে বললেন, হুযূর আমার ফলের মূল্য কি এখনও পরিশোধ হয় নাই? হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, হ্যাঁ হয়েছে। তবে আর একটি শর্তে তোমাকে মুক্তি দিতে পারি। হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, কি আপনার শর্ত? হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, আমার একটি মেয়ে আছে তাকে বিয়ে করতে হবে। মেয়েটি অন্ধ, বোবা, বধির, খঞ্জ, লুলা, কালো ও কুৎসিত। শুনে হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি ভাবলেন, এ ধরনের একটি মেয়েকে বিয়ে করবো! যার কাছ থেকে খেদমত পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো তাকেই খেদমত করতে হবে। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলেন, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, কাজেই এখন যদি তিনি ক্ষমা না করেন (বিবাহ করা ব্যতিত) তবে আল্লাহ পাক উনার কাছে কি জবাব দিব ইত্যাদি চিন্তা করে রাজী হয়ে গেলেন। বিয়ে হয়ে গেল। হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বাসর ঘরে প্রবেশ করেই (হযরত আব্দুল্লাহ সাওমায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি যা বলেছেন তার বিপরীত দেখতে পেয়েই) তাড়াহুড়া করে ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। ঘর থেকে বের হয়েই দেখলেন, সন্মুখের রাস্তায় (ঘরের সামনে একটি ছোট রাস্তা ছিল) হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি কে। বললেন, হুযূর আপনি যা বলছিলেন এখন দেখি তার বিপরীত। হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন (যা তিনি পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন এমন কিছু ঘটবে) বাবা এই তোমার স্ত্রী। রাত কাটাও। সকালে তোমার প্রশ্নের জবাব দেব।

পরদিন হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি কে বললেন, বাবা- আমার মেয়েকে আমি অন্ধ বলেছি এই জন্যে, আমার মেয়ে কখনও কোন পর পুরুষকে দেখেনি; বোবা বলেছি এজন্যে- সে কখনও কোন পাপের কথা মুখে আনেনি; বধির বলেছি এজন্যে- সে কখনও পাপের কথা কানে শুনেনি; খঞ্জ ও লুলা বলেছি এজন্যে- সে কখনও কোন পাপের পথে পা বাড়ায়নি এবং কোন পাপ কাজ স্পর্ষ করেনি; কালো ও কুৎসিত এজন্যে বলেছি- তাকে কখনও কোন পর পুরুষ দেখেনি। এই কথা শুনে হযরত আবু সলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি আল্লাহ পাক উনার শোকরগুজার করলেন। এখানে ফিকিরের বিষয়, কেমন নেককার ও পরহেজগার মোত্তাকী পিতা ও মাতার ঘরে অলিয়ে মাদারজাত গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি জন্ম গ্রহন করেন।

রবিউস সানী-১৪১২, কার্তিক-১৩৯৮, অক্টোবর-নভেম্বর-১৯৯১ ঈসায়ী


0 Comments: